দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স প্রবাহ যখন কমে যাচ্ছে, ঠিক এমন সময়েই ওমান বাংলাদেশীদের ভিসা দেয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ দিল। এতে অভিবাসন খাতে স্বাভাবিকভাবেই চাপ পড়বে। এজন্য বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতার বিকল্প নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন। এছাড়া নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার বিষয়টিও নতুন করে উঠে আসছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভিসা দেয়া স্থগিত করেছে ওমান। পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত বাংলাদেশীদের জন্য যেকোনো ধরনের ভিসা না দেয়া এবং ওমানে ট্যুরিস্ট ও ভিজিট ভিসায় আসা প্রবাসীদের ভিসা পরিবর্তন করার সুযোগও স্থগিত করেছে রয়্যাল ওমান পুলিশ (আরপিও)। সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের পর বাংলাদেশী অভিবাসীদের প্রধান গন্তব্যস্থল ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী এ দেশ। শুধু কর্মক্ষেত্রই নয়, ওমান প্রতি বছর গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের বড় উৎস।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশী প্রবাসীরা বিপুল টাকা খরচ করে ওমানে গিয়ে ঠিকমতো কাজ পান না। এতে নিরুপায় হয়ে তারা অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। তাই ভিসার অপব্যবহার ঠেকাতে দেশটি বাংলাদেশীদের জন্য সব ধরনের ভিসা দেয়া স্থগিত করেছে। সম্প্রতি ওমান প্রত্যেক তরুণের জন্য পাঁচজন করে বিদেশী কর্মী নিয়োগের অনুমতি দিয়েছে। সে সুযোগকে এক শ্রেণীর মানব পাচারকারী অপব্যবহার করছে। তারা কর্মসংস্থানের বিষয়ে যাচাই-বাছাই না করেই বাংলাদেশ থেকে ওমানে লোক নিচ্ছে। এসব লোকজন ওমানে এসে প্রতিশ্রুত কাজ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে রাস্তাঘাটে এমন সব কাজ করছেন, যা দেশটির প্রচলিত আইনে বিধিসম্মত নয়। কেউ কেউ আবার বাধ্য হয়ে অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশীদের এমন কর্মকাণ্ড ওমান কর্তৃপক্ষকে অসন্তুষ্ট করে তুলেছে বলে জানা গেছে।
ওমানের একটি সূত্র অনুযায়ী, ভিসার অপব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দেয়া স্থগিত করা হয়েছে, ওমানের সাম্প্রতিক উদ্যোগে সেটি স্পষ্ট। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে ওমানে কাজ করছেন, এ বিবেচনায় ওমানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হবে। এ ব্যাপারে ওমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
চলতি বছরের ১০ মাসে অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশী ওমানে গেছেন। এ মুহূর্তে ওমানে বিভিন্ন দেশের কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। যার মধ্যে বাংলাদেশী কর্মী সর্বোচ্চ। প্রায় আট লাখ বাংলাদেশী দেশটিতে কাজ করছেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, আগে অল্পসংখ্যক প্রবাসী দেশটিতে কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি জমালেও ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশী অভিবাসীদের জন্য বড় গন্তব্য হয়ে ওঠে।
মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দেশে শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১২ সালে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দীর্ঘ নয় বছর বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালে দেশটি ভিসা প্রক্রিয়া আবার চালু করে বলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) সূত্রে জানা গেছে। এখন ওমানও একই পথে হাঁটছে কিনা সে বিষয়ে দ্রুত খোঁজ নেয়ার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রকৃতপক্ষে ওমান কী কারণে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ঠিকমতো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দেশটি সৌদি আরবের মতো নিজস্ব জনবল দিয়ে কাজ করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে, তা জানতে হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
যদিও ঢাকায় অবস্থিত ওমান দূতাবাস সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ভিসা দেয়া স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি অন্যান্য দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সমভাবে কার্যকর করা হয়েছে এবং সিদ্ধান্তটি সাময়িক পদক্ষেপ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে যাতে এ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে পুনরায় ভিসা দেয়ার কার্যক্রম শুরু করা যায়।
গত সেপ্টেম্বরে ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স এসেছে। বৈদেশিক মুদ্রা মজুদে রেমিট্যান্সের ভূমিকা কমে যাওয়া দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ। সংকটকালীন এ সময়ে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে কোনো দুঃসংবাদ কাম্য নয়। এজন্য ওমানে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসকে কাজে লাগিয়ে যথাযথ কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান করে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণ করে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখার বিকল্প নেই। বিদেশগামী শ্রমিকদের প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। এতে প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি দরকষাকষির সুযোগও তৈরি হবে।
আমরা প্রত্যাশা করব, বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট বিবেচনায় দ্রুত বাংলাদেশ ওমানের সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ করবে। এক্ষেত্রে বিলম্ব হলে তা রেমিট্যান্সের ওপর নিঃসন্দেহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা এ মুহূর্তে সংকটের বোঝাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।










