ড. তোফাজ্জল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। তিনি ২০০২ সালে জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাপ্লায়েড বায়োসায়েন্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। বিশ্ব বিজ্ঞান একাডেমি ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির নির্বাচিত ফেলো ফুলব্রাইট। সম্প্রতি দেশের উচ্চ শিক্ষার নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক
গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় (রিসার্চ ইউনিভার্সিটি) কীভাবে গড়ে ওঠে?
বিশ্ববিদ্যলয়ের তিনটি উদ্দেশ্য—জ্ঞান সৃজন করা, সংরক্ষণ করা এবং জ্ঞানকে বিতরণ করা। কীভাবে এবং কী জন্য জ্ঞান সৃজন করি? বর্তমানে যে অর্থনীতি চলছে, তা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি। যে প্রযুক্তিগুলো আমরা ব্যবহার করছি, সেই প্রযুক্তির কাঁচামালই হচ্ছে জ্ঞান। গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই গবেষণাভিত্তিক হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাভিত্তিক করতে হলে দুটো দিকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। গবেষণার পরিবেশ ও মান। এ দুটো দিকে যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুরুত্ব দেয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেবে। এর সঙ্গে আরো কয়েকটি বিষয় যুক্ত আছে। বিশ্ববিদ্যালয় যখন গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃজন করবে, তখন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আসবে। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর যখন জ্ঞান দরকার হবে, তখন তারা প্রচুর প্রযুক্তি উদ্ভাবনে যাবে। গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি (আউটলুক)। বিশ্ববিদ্যালয় যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, এটি সারা পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। কাজেই এ মৌলিক দর্শনগুলো একত্রিত করা গলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
দেশে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কেন প্রতিষ্ঠা করছি? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কী প্রত্যাশা করি? ওই মৌলিক দর্শন যদি সুনির্দিষ্ট থাকে, তাহলে আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা সম্ভব। কিন্তু আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। জ্ঞান সৃজন করতে হলে গবেষণায় মনোযোগ দিতে হবে। গবেষণার পরিবেশ তৈরি করে দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তহবিল বা অর্থায়ন আসার প্রক্রিয়াটি সরকারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে হবে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড কিংবা ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) বাজেটের একটি বড় অংশ আসে সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। কিন্তু আমাদের দেশে তা ব্যতিক্রম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো একটি বিভাগ গবেষণা ল্যাব করতে চায়। আর সেটা যদি কোনো জনহিতৈষী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান করে দিতে চান তাহলে তার নাম ব্যবহার করতে আমরা সংকোচ বোধ করি। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশে এ সংস্কৃতি এখনো তৈরি হয়নি। হার্ভার্ড কিংবা এমআইটির যে আইন রয়েছে, সেখানে এনডাওমেন্ট বা অনুদানের কথা বলা আছে এবং তা কার্যকর। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আইনে থাকলেও আমরা এ দিকটিতে মনোযোগ দিচ্ছি না।
গবেষণার দিককে আমরা কখনই গুরুত্ব দিইনি। আরেকটি বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল তাত্ত্বিক গবেষণার মধ্যে সীমিত রাখলে হবে না। সমাজ বা পৃথিবী বা মানবজাতির যে সমস্যা আছে এবং প্রকৃতির যে সমস্যা আছে, সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে হবে। সমস্যা সমাধানভিত্তিক গবেষণা সংস্কৃতির প্রচলন করতে হবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সংস্কৃতিগত ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে মনোসংযোগ করতে হবে। তাহলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতক কেবল রাষ্ট্রের জন্যই নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য সম্পদে পরিণত হবে। সর্বোপরি, উপাচার্য নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণায় অবদান এবং পেশাগত নেতৃত্বদানের দক্ষতাকে বিবেচনায় আনতে হবে।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অতিমাত্রায় দলীয়করণ ঘটেছে। বিষয়টি শিক্ষা-গবেষণায় কোনো প্রভাব ফেলছে?
অবশ্যই প্রভাব ফেলছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তাহলে তিনি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে গেলেন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকের দলীয়করণের যে সিস্টেম তা কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি হিসেবে পরিচিত। এর ফলে কেন্দ্র থেকে যে নির্দেশনা আসবে সেটি শিক্ষক কিংবা ছাত্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে মুক্ত বুদ্ধি-চিন্তার একটি স্বাধীন জায়গা। ইতালিতে বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয় (Bologna University) আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে (১০৮৮ সালে) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বলতে বুঝিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়কে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখবে, স্বাধীনভাবে জ্ঞান চর্চা করা হবে এবং মানুষের মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটবে। এ জায়গায় আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত না যাব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে কখনই স্বাধীনভাবে উদ্ভাবন বা নতুন জ্ঞানের সৃজন করতে পারব না। আমরা যদি হাজার বছর আগে ফিরে যাই, তখন দেখা যাবে গবেষণা করার জন্য গ্যালিলিও বা সক্রেটিসের মতো দার্শনিকদের রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। রাষ্ট্রের প্রভাবই সে রকম। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে নিয়ে আসা হয়েছে, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসিত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের স্বায়ত্তশাসনকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলতে বোঝায় সিনেট ও সিন্ডিকেট, সেখানে সরকারি কর্মকর্তা কিংবা রাজনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেয়। যারা দলীয় রাজনীতি করেন, তারা দেশের রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নিয়ে আসতে সাংঘাতিক রকমের আনন্দ অনুভব করেন। কিন্তু এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। রাজনীতি থেকে মুক্ত রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় আমরা দেশে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে পাব না।
বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখা কার দায়িত্ব?
বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। রাষ্ট্রকেই এ নীতি ঠিক করতে হবে। এ নীতি শক্তভাবে অনুসরণ করা হলে রাষ্ট্রই এর সুফল ভোগ করবে।
অনেকেই বলছেন, দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণার মান কমছে। আপনি কী মনে করেন?
আমি নিজে একটি সরকারি অর্থায়নের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। এ বছর টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবারের মতো এক হাজারের মধ্যে এসেছে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ৮০০ থেকে ১০০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। এ পাঁচটির মধ্যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান সবার ওপরে। দেশের বড় বড় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়—বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি উঠে এসেছে। কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে গবেষণাভিত্তিক একটি সংস্কৃতি বিরাজ করছে এবং এ সংস্কৃতি সংরক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অন্যান্য সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান দিনে দিনে নেমে গেছে বলে আমি মনে করি না। কারণ টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ের ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ২০১৬ সালে সারা বিশ্বের ৯৮০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৬০১তম। বর্তমান ডাটাবেজে প্রায় বিশ্বের দুই হাজারের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশ করেছে। সেখানে ১০০০ থেকে ১২০০-এর ভেতরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সবাই বলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে গেছে। র্যাংকিংয়ের মোট স্কোর-১০০। সারা পৃথিবীতে এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ড, যার স্কোর ১০০। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সূচক মিলিয়ে মোট স্কোর হয়েছে প্রায় ৩৬। অথচ পাঁচ বছর আগে সেটি আরো অনেক কম ছিল। কিন্তু ৩৬ হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়টি পিছিয়ে গেছে। কারণ অন্যরা দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আরো দ্রুতগতিতে এগোতে হবে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত মানকে উন্নত করতে মনোযোগ দিতে হবে।
কীভাবে র্যাংকিংয়ে আরো ভালো করা যায়?
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং আরো ভালো করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য হালনাগাদের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কারণ র্যাংকিংয়ের ডাটাবেজে যে তথ্যগুলো দরকার হয় সেগুলো হালনাগাদ করে নিজেদেরই সরবরাহ করতে হবে। যদি এটি সঠিকভাবে নিয়মিত করা যায়, তাহলে প্রতি বছরই বিশ্ব র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়বে। এ বছর ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে এসেছে। আগামীতে হয়তো ২০-২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আসতে পারে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এরই মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। এ সচেতনতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই তৈরি হয়েছে। কারণ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একজন ব্যক্তি গবেষকেরও র্যাংকিং হয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও কোর্সেরও র্যাংকিং হয়। আমেরিকায় প্রায় তিন হাজার বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সেখানে ব্যক্তি, বিভাগ ও কোর্স পর্যন্ত র্যাংকিং হয়। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে আরেকটি বড় নিয়ামক হচ্ছে কোনো শিক্ষক বা গবেষকের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বা খ্যাতি। কোনো একজন গবেষকের গবেষণা প্রবন্ধের সঙ্গে কয়টি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সহলেখক আছেন সেটিও একটি বড় বিষয়।
আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে আছি। এ যুগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইট হালনাগাদ থাকার কথা। কিন্তু তেমন অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। এর কারণ কী?
এর প্রধান কারণ হচ্ছে, বিগত সময়ে আমরা দলীয় রাজনীতির প্রতিযোগিতায় বেশি মনোযোগী ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পবিত্র স্থান হিসেবে তৈরি করতে পারিনি আমরা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনীতির ক্ষেত্রে খুব মনোযোগ ছিল। এ জায়গা থেকে যদি মনোযোগ সরিয়ে আনতে পারি তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবর্তন সূচিত হবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়কে বাজেট বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে এর র্যাংকিংকে বিবেচনায় নেয়া উচিত। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) আরো শক্তিশালী করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডাটাবেজ হালনাগাদ করা সম্ভব। প্রত্যেক শিক্ষকের বার্ষিক প্রতিবেদনে সব বিষয় উল্লেখের ব্যবস্থা করতে হবে। অনলাইনে সব হালনাগাদ করে রাখতে হবে। এ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় আমরা মনোযোগ দিলে নিশ্চিতভাবে এটা করা সম্ভব। বাংলাদেশে এত বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করেন এবং ডাটার যে প্রোফাইল তৈরি করেন—তাতে পৃথিবীর যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি একজন বাংলাদেশীর বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কেন ডাটাবেজ করতে পারব না? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করতে হবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পিএইচডি শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম। পোস্টডক তো নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পিএইচডি এবং পোস্টডকের জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ রাখা দরকার। গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করবে। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করলে থিওরিটিক্যাল ফ্রেম ওয়ার্কের মধ্যে তো নিজে নিজে হবে না। নেতৃত্ব তৈরি এবং বিশ্বমানের শিক্ষা দেয়ার কাজটি বিশ্ববিদ্যালয়কে করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিকীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় রাজনীতি থেকে বের করে নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত, বিশ্ব চ্যালেঞ্জগুলো বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে কেন্দ্র করে বড় বড় বৈশ্বিক প্রকল্প রয়েছে, সেগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশে যেসব স্থানীয় সমস্যা রয়েছে সেগুলোকে গ্লোবাল ট্যালেন্টের সঙ্গে যুক্ত করে সমাধানের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
সরকারি হিসাবে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখেরও বেশি। তারা তাদের প্রত্যাশা অনুপাতে চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে অনেকেই নিম্ন পদে চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিরা বলছেন, তারা তাদের চাহিদা অনুপাতে দক্ষ কর্মী পাচ্ছেন না। এখানে ঘাটতি কোথায়?
সবচেয়ে বড় ঘাটতি হচ্ছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক স্থাপন হয়নি। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের যা দরকার সেই বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে গুরুত্ব পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে বলা হয়ে থাকে একাডেমিক গবেষণা। ২০২৪ সালে যারা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তাদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছেন। তাদের জ্ঞান আবিষ্কারের ফলে বিশ্বের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের শিল্পের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ দ্রুত করা উচিত এবং এটি অবশ্যই শক্তিশালীভাবে করতে হবে। সরকার পলিসি করতে পারে। যখন পোস্টডক করেছিলাম, তখন জাপান একটি আইন করেছিল, সেই আইনে প্রত্যেকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের একটি নির্দিষ্ট হিস্যা আরঅ্যান্ডডিতে (রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) ব্যয়ের কথা বলা হলো। শুরুর দিকে সবগুলো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা অবকাঠামো এত উন্নত ছিল না। তাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ল্যাবে বিনিয়োগ করতে বলা হলো। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্যাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে জানানো হলো এবং সমস্যার সমাধান করতে পারলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কী পরিমাণ অর্থায়ন করবে তাও তাকে জানানো হয়। এভাবে জাপানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে জাপানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যেমন লাভবান হচ্ছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও লাভবান হচ্ছে। সর্বোপরি রাষ্ট্রও লাভবান হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম অনেক পুরনো। পাঠ্যক্রম তৈরির ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যেমন আলোচনা করা দরকার, তেমনি সমাজের অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গেও বসা দরকার। অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্লেষণী ক্ষমতাসম্পন্ন গবেষক তৈরি করবে। শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মী তৈরি করবে না। কিন্তু শিল্পগুলো কী চায়, সেটির লক্ষ্যমাত্রা এখনই নির্ধারণ করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কী চায় সেটা বুঝতে হলে আগে চাহিদা মূল্যায়ন জরিপ করতে হবে এবং এ জরিপের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই বিষয়গুলো টিকে থাকবে। উত্তর আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সব বিষয় কিন্তু টিকে থাকছে না। ফলে শিল্পের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নতুন নতুন বিষয় বিকশিত হচ্ছে সেখানে। সেভাবে বাংলাদেশ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে অগ্রগতির বিষয়ে বছরভিত্তিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতসহ সমন্বিত উপায়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে তদারকি করতে হবে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে। ১৯৮০ মডেলের পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতেই এখনো কৃষিতে দেশের ছয়টি প্রতিষ্ঠান ডিগ্রি দিচ্ছে। কৃষিতে মাঠে যে পরিবর্তন হয়েছে সেই পরিবর্তনকে বিবেচনা করে কৃষির স্নাতক ডিগ্রিধারীকে একটি ইন্টার্নশিপে নিয়ে যাওয়া দরকার। স্নাতক ডিগ্রিধারীরা শিল্পে ইন্টার্নশিপ কাজ করবে। এর মাধ্যমে শিল্প স্বল্প ব্যয়ে একজন কর্মী পেল এবং সেই কর্মী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ হয়ে উঠবে। এতে উভয়েই সমান সমান লাভবান হবে। এ শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা হবে। এটি কৃষি, বিজ্ঞান বা অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও হতে পারে। এটি কোনো কঠিন কাজ নয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু সংস্কারের মাধ্যমে এটি সহজেই করা সম্ভব। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও রাষ্ট্রের মনঃসংযোগ।
কী ধরনের সংস্কার করতে হবে?
শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, বাস্তব ও জীবনমুখী এবং পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। চার বছর মেয়াদি কোর্সের মধ্যে শিক্ষার্থীকে তিন বছর শ্রেণীকক্ষে ও ল্যাবে রেখে ক্রিটিক্যাল থিংকার এবং বিশ্লেষণ সক্ষম গবেষক ও বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানী তৈরি করতে হবে। আর ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে এক বছর বাস্তব জীবনে ছেড়ে দিতে হবে। দেশে অনেক শিক্ষার্থী। কোন শিল্প তাকে নেবে? কোন ফিল্ডে যাবে? কোন প্রতিষ্ঠানে যাবে? সরকার যদি পলিসির মাধ্যমে বলে দেয়, শিক্ষার্থীদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ইন্টার্নশিপের জন্য নিতে হবে, তাহলে সহজ হবে। কারণ শিল্পের ভবিষ্যতে দক্ষ কর্মী দরকার। এ দক্ষ কর্মী স্নাতক পর্যায়েই শিল্পের সিস্টেমে প্রবেশ করে যাবে। এটি উন্নত বিশ্বের সবাই করছে। চীনের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, তারা উদীয়মান শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে, তার মূল রহস্য এ ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি শিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ বাড়াতে হবে। ব্যবহারিক দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশে শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং মূল্যায়নে আমূল সংস্কার করতে হবে।










