মেট্রোরেল যুগে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে বছরখানেক হয়েছে। এবার সময়ের পরিক্রমায় পূর্ণতা পেল ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল। রাজধানীবাসী এরই মধ্যে মেট্রোরেলের সুফল পেতে শুরু করেছে। ব্যাপক যানজটময় ঢাকা শহরে তাই মেট্রোরেল ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। তবে সময়সীমা বাড়ানোসহ আরো যেসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে, সেসব বিবেচনায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় মেট্রোরেল চলাচল নিশ্চিত করলে মেট্রোরেল আরো জনপ্রিয়তা পাবে বলে আশা করা যায়।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, দেশের প্রথম মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-৬) উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ উদ্বোধন হয়েছে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর। এর পরদিন থেকে এ পথে বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচল শুরু হয়। একই মেট্রোর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশ গত শনিবার উদ্বোধন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ৩১১ দিনের ব্যবধানে পূর্ণতা পেল ঢাকার প্রথম মেট্রো। উদ্বোধনের পর আগারগাঁও-মতিঝিল অংশে সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক ট্রেন চলতে শুরু করেছে। এছাড়া হেমায়েতপুর-ভাটারার মধ্যে নির্মিতব্য ঢাকার তৃতীয় মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-৫, নর্দান রুট) নির্মাণকাজও উদ্বোধন হয়েছে।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কাউন্সিল একনেক মেট্রোরেল প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। ‘বাঁচবে সময়, বাঁচবে তেল— জ্যাম কমাবে মেট্রোরেল’ স্লোগান নিয়ে ২০১৬ সালের জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।
এশিয়ার মধ্যে ২২তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে মেট্রোরেল চালু হয়েছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশে শহরের ভেতরে গণপরিবহন হিসেবে মেট্রোরেল সেবা চালু রয়েছে।
নাগরিকদের সহজে যাতায়াত ও কাজের সময় বাঁচানোর জন্য এ প্রকল্প নেয়া হয়। মেট্রোরেল পুরোদমে চালু হলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর ঢাকার মানুষ তীব্র যানজট থেকে অনেকটাই মুক্তি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া ঢাকায় এমআরটি লাইন-৬-এর পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে আরো পাঁচটি মেট্রোরেল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-১-এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। এমআরটি লাইন-১-এর রুট বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এবং বাংলাদেশের প্রথম পাতাল রেল হওয়ার কথা এটির। পাশাপাশি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গুলশানের ভাটারা পর্যন্ত উড়াল ও পাতাল মিলিয়ে ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৫: নর্দান রুটের নকশার শেষ পর্যায়ের কাজ চলমান রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে গাবতলী থেকে আফতাবনগর, গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ ও কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত আরো তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ চলছে।
মেট্রোরেল আগারগাঁও-মতিঝিল অংশে চলাচল শুরুর পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মধ্যে নতুন এক গতির পথ তৈরি হলো। ফলে ৩৮ মিনিটেই মেট্রোরেলে করে উত্তরা থেকে সরাসরি মতিঝিল যাওয়া যাবে। এতে এ রুটে চলাচল করা যাত্রীরা সুবিধা পাবেন। তাদের যাপিত জীবনে অতিরিক্ত সময় যুক্ত হবে, যা জীবনকে আরো ‘প্রডাক্টিভ’ করে তুলবে, এতদিন জ্যামের মধ্যে যে সময়গুলো নষ্ট হতো। এজন্য মেট্রোরেল চলাচলে বর্ধিত অংশ যুক্ত হওয়ায় উচ্ছ্বসিত হয়েছেন নানা পেশাজীবী ও সাধারণ বাসিন্দারা। আগে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে বাসে বসে অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে মেট্রোরেলের নির্বিঘ্ন যাত্রা জনমনে মানসিক স্বস্তি নিয়ে এসেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মেট্রোরেলে স্বল্প সময়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়া যাচ্ছে। কোনো যানজটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। ভাড়া নিয়ে তর্ক কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নেই। এসব কারণে মেট্রোরেলে চলাচলে যাত্রীদের মানসিকভাবে কোনো বিষণ্ণতা বা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য উদগ্রীব থাকতে হবে না। এভাবে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে মেট্রোরেল যে ভূমিকা রাখছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
মেট্রোরেলের প্রতি যাত্রীদের এ উচ্ছ্বাসের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য মেট্রোরেলের সময়সূচি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে মেট্রোরেলের প্রতি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এর আগে মেট্রোরেলে ঢিল ছোড়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এমনটি ভবিষ্যতে কাম্য নয়।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও মেট্রোরেল সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হবে, এটিই আমাদের প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে মেট্রোরেল পরিচালনাকারী সংস্থাকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং সুষ্ঠু পরিচালনার ভিত্তিতে মেট্রোরেল চলাচল অব্যাহত থাকুক। সফল উদাহরণের ভিত্তিতে মেট্রোরেলের বাকি প্রকল্পগুলোও সফলতার মুখ দেখুক, এটিই আমাদের কাম্য।










