কোনো ঘোষণা ছাড়াই ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডিমের আড়তগুলো বন্ধ রাখায় গত রোববার রাত থেকে বাজারে ডিমের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। ডিমের পাশাপাশি সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে কাঁচামরিচেরও। ফলে উচ্চ মূল্য দিয়েও ভোক্তারা এ দুটি পণ্য পাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরেই ডিমের বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী। স্বস্তি নেই মাংস-সবজি ও চালের বাজারেও। গত ১৬ সেপ্টেম্বর দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার কতিপয় পণ্যের বিশেষ করে ডিম ও মুরগির মূল্যও বেঁধে দিয়েছে। বেঁধে দেয়া মূল্য বাস্তবায়ন করতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের আড়তের ব্যবসায়ীরা ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। শুধু মূল্য বেঁধে দিয়ে কিংবা বাজারে অভিযান পরিচালনা করে পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় না—এটি তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হলে সরকারকে পাঁচটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে। প্রথমত, সরকারকে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে; দ্বিতীয়ত, পচনশীল নয় এমন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরকারি মজুদ ও আমদানি বাড়াতে হবে; তৃতীয়ত, বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে; চতুর্থত, বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে এবং পঞ্চমত, বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়মিত বাজার তদারকি করতে হবে। অর্থাৎ যখন বাজারে পণ্যের ঘাটতি তৈরি হবে, তখন সরকারি মজুদ থেকে বাজারে পণ্যের সরবরাহ করতে হবে। সর্বোপরি, এসব পদক্ষেপ ব্যতীত বাজারে পণ্যের মূল্য কমানো কঠিন।
সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের বড় উৎস ডিম ও মুরগির মাংস। দেশে প্রতিদিন ডিমের গড় চাহিদা চার থেকে সাড়ে চার কোটি পিস এবং মুরগির মাংসের চাহিদা ৫ হাজার ২০০ টন। বন্যাদুর্গতসহ সর্বসাধারণের আমিষের চাহিদা পূরণে ও ডিমের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে সরবরাহ ঘাটতি দূর করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যায় কৃষিপণ্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় ১১টি জেলা প্লাবিত হওয়ায় তলিয়ে যায় ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরের কয়েক হাজার মুরগির খামার। মারা গেছে লাখ লাখ মুরগি। বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) তথ্যমতে, এ চার জেলায় আগে গড়ে প্রতিদিন ডিমের উৎপাদন ছিল প্রায় ৪০ লাখ পিস। এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বন্যাকবলিত অন্য জেলায় কমেছে আরো দেড়-দুই লাখ পিস ডিম উৎপাদন। তাতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে চাপ রয়েছে। এ ঘাটতি মোকাবেলায় পণ্য আমদানি স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ার কথা। কিন্তু নিত্যপণ্যের আমদানি কমায় দাম বেড়েই চলেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, বিগত সরকারের পতনের পর দুই মাসে (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) ভোজ্যতেল, চিনি ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যের আমদানি কমে গেছে। বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দামও বাড়ছে। আমদানি কমায় নিত্যপণ্যের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ময়দা, সয়াবিন তেল, পাম তেল ও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এখনো কাটেনি, এ কারণে ব্যবসায় মন্দা ভাব বিরাজ করছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সময় নিয়েছেন তারা। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকারের কাছ থেকে কোনো দিকনির্দেশনাও পাচ্ছেন না। আবার ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলা নিয়ে সমস্যা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ কমছে। সরবরাহ না বাড়লে সামনে এসব পণ্যের ঘাটতি আরো বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে চিনি ও ভোজ্যতেলে শুল্ক কমানোসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কিন্তু সরবরাহ না বাড়িয়ে বাজারে অভিযান পরিচালনা, পণ্যের দাম নির্ধারণ ও শুধু শুল্ক কর কমানোর মতো বাজার ব্যবস্থাপনা দিয়ে এ পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হবে না। বেসরকারি খাতকে নির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি সরকারকেও আমদানির প্রস্তুতি নিতে হবে। তা না হলে দেশে খাদ্য সংকটের সৃষ্টি হতে পারে।
খামারিদের দাবি, ডিমের মূল্যবৃদ্ধির জন্য উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ সংকট দায়ী। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ দুই সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ৮ অক্টোবর সাড়ে চার কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছে; কিন্তু উৎপাদন খরচ কমানোর দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
বিগত সরকারের আমলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে মানুষের জীবনযাপন ব্যয় বেড়েছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও নিত্যপণ্যের দাম কমেনি বরং বেড়েছে। সব ধরনের সবজির দাম এখনো ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচামরিচের দাম। গত সোমবার বাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হয়েছে ৬০০-৭০০ টাকায়, যা সপ্তাহখানেক আগেও ছিল ১৮০-২২০ টাকা। তার মধ্যে বাজারে সংকটও রয়েছে নিত্যপণ্যটির। সংকট থাকায় অনেক ক্রেতাকেই কাঁচামরিচ না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে গ্রীষ্মকালীন মরিচের প্রায় ৮০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে এবং দাম বেড়েছে।
এছাড়া বাণিজ্য, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে উৎপাদন ও চাহিদার হিসাব প্রাক্কলন করে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে ঘাটতি কত হবে এবং তা কীভাবে মোকাবেলা করা যাবে, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অনেক দেশেও পণ্যের দাম বেড়েছে। এসব দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে পারলেও বাংলাদেশ এখনো পারেনি। এছাড়া বাংলাদেশের প্রতিবেশী শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল ও ভারত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। এর মধ্যে শ্রীলংকা অন্যতম। দেশটি বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা ও সুশাসন নিশ্চিত করার কারণে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে পেরেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের জন্য শ্রীলংকা উদাহরণ হতে পারে। ডলারসহ অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি উসকে ওঠা দেশগুলোর একটি ছিল শ্রীলংকা। দুই বছর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রটির মূল্যস্ফীতির হার ঠেকে ৭০ শতাংশে। বৈদেশিক দায় পরিশোধে ব্যর্থতায় নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করা দেশটির মূল্যস্ফীতি এখন ১ শতাংশেরও নিচে। গত আগস্টে দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল দশমিক ৫ শতাংশ। ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক সে পরিস্থিতি দ্রুতই কাটিয়ে উঠছে শ্রীলংকা।
যদিও গতকাল মঙ্গলবার থেকে সরকার প্রথমবারের মতো ডিম আর সবজিও খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) শুরু করেছে। রাজধানীর ২০টি পয়েন্টে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে ১০টি পণ্য কিনতে পারছে নিম্ন আয়ের মানুষ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সবজি বিক্রির দায়িত্বে থাকবে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। মূলত ভেন্ডরের মাধ্যমে তারা সবজি বিক্রি করবে। সরকারের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ভালো। তবে এ জনবহুল ঢাকা শহরে ২০টি পয়েন্টে সবাই এ সুবিধার আওতায় আসবে কিনা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। বাজারে পণ্য সরবরাহ ঘাটতি থাকায় সেখানে ক্রেতার বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এ চাপ সামলাতে এসব পয়েন্টে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে। তা না হলে মানুষ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।
বিগত সরকারের আমলে দেশে পণ্য আমদানিতে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানির নিবন্ধন দিয়েছিল। ফলে গুটিকয়েক ব্যক্তি বা কোম্পানির হাতে পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল। তাদের কাছেই বাজার জিম্মি। তাদের প্রভাব কমাতে ও বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে ছোট-বড় সব ধরনের কোম্পানিকে আমদানি নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে হবে। আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়িয়ে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে হবে। আবার কোনো ধরনের প্রভাব ও প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই যেন ছোট-বড় সব আমদানিকারক পণ্য আমদানি ও বিপণন করতে পারে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়লে আমদানির পরিমাণ বাড়বে এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। পণ্যের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে।
বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নাগালে রাখতে সরবরাহ বাড়িয়ে বাজার তদারকিতে সরকারকে কঠোর হতে হবে। আর অসাধু ব্যবসায়ী, দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী ও অবৈধ মজুদদারদের আইনের আওতায় আনতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিবেদন পেলেই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারিভাবে বিভিন্ন পণ্যের মজুদ বাড়াতে হবে। বাজারে যখন পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে তখনই সরকারি মজুদ থেকে বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। যখন সরকারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকবে তখন কৃত্রিম মজুদকারীরাও পণ্য মজুদ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে। এ কাজটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সম্মিলিতভাবে করতে হবে।










