দেশের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে রাজস্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এজন্য সঠিকভাবে রাজস্ব আহরণ স্বার্থে কর আয়ের সহজ হওয়া প্রয়োজন। এটি যত দ্রুত উপলব্ধি হবে, কর আহরণেও বেড়েছে। বস্তুত সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে করযোগ্য ব্যক্তিদের থেকে কর আদায়ের বিষয়টি বারবার উঠে আসছে। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যথাযথ ভূমিকা কাম্য। পাশাপাশি কর আদায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যায় সেটি পর্যালোচনা করতে হবে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, কর সচেতনতার অভাব এবং বিদ্যমান কর প্রদান প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে অনেকেই কর দেন না। যেমন সিলেট অঞ্চল প্রবাসী অধ্যুষিত হওয়ায় সেখানে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেশি এবং মানুষের হাতে টাকা রয়েছে। তাই কর আহরণের সম্ভাবনা থাকলেও সেখানে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে কর আহরণ হচ্ছে না। সম্প্রতি সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতি এবং এসএমএসি আইটি লিমিটেডের সহযোগিতায় সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এসসিসিআই) আয়োজিত এক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

‘ট্যাক্স-ডুর মাধ্যমে ব্যক্তিগত আয়কর ও রিটার্ন জমাদানের মৌলিক বিষয়াদি’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালায় বলা হয়, সম্পূর্ণ অটোমেটেড সিস্টেমে অনলাইনে ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন সহজ ও নির্ভুলভাবে গণনা ও প্রস্তুত করে দেবে ‘ট্যাক্স-ডু’। এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে ঘরে বসে যে কেউ অনলাইনে কয়েক মিনিটের মধ্যে আয়কর রিটার্ন পূরণ করতে পারবেন। 

প্রকৃতপক্ষে কর প্রদানের প্রক্রিয়া এমন সহজ হওয়াই কাম্য। তাছাড়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই এটি সম্ভব, এজন্য কর আহরণে প্রযুক্তির সংশ্লিষ্টতা বাড়াতে হবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যোগ হলেই যে সফলতা পাওয়া যাবে বিষয়টি এত সহজ নয়। কারণ অতীতে ভ্যাট আহরণের জন্য ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। 

বাংলাদেশে কর রাজস্ব জিডিপির অনুপাত আশাব্যঞ্জক নয় বলে মত অর্থনীতিবিদদের। ধারণা করেই বলা হয়, আমাদের করজালের পরিধি ছোট। দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি হলেও ১৩ এপ্রিল ২০২৩-এর হিসাব অনুযায়ী নিবন্ধিত ব্যক্তি আয়করদাতার সংখ্যা ৮৫ লাখ ৬ হাজার ৬১১, যা করযোগ্য উপার্জনকারীর তুলনায় মোটেও ভারসাম্যপূর্ণ নয়। 

এজন্য রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে করজাল বিস্তৃত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যক্ষ কর না দিয়ে বা বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দিয়ে একদিকে অনেকে রেহাই পাচ্ছেন, অন্যদিকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর করের চাপ বাড়ছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অপ্রত্যক্ষ করের বোঝা বাড়ছে। আয়কর রিটার্ন জমা দেয়া সহজ করা এবং লোকজনকে আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করে দেশে কর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ২০১০ সালে সর্বপ্রথম ঢাকা ও চট্টগ্রামে আয়কর মেলার আয়োজন করে এনবিআর। শুরুতে সাড়া না মিললেও পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের কাছে এ মেলা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতি বছর করদাতাদের বড় অংশ মেলায় রিটার্ন দিতেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত মেলা ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। 

করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালে মেলা আয়োজন বন্ধ রাখে এনবিআর। এর পর থেকে মেলার আয়োজন বন্ধ রাখা হয়েছে। এ নিয়ে টানা তিন বছর মেলা হচ্ছে না। সর্বশেষ ২০১৯ সালে সপ্তাহব্যাপী আয়কর মেলায় ৬ লাখ ৫৫ হাজার করদাতা রিটার্ন জমা দেন। তবে সাধারণ করদাতাদের মাঝে আগ্রহ থাকলেও এনবিআর এবারো আয়কর মেলার আয়োজন করেনি। এর পরিবর্তে সেবা মাস (১-৩০ নভেম্বর) উদযাপন করা হচ্ছে। তবে আয়কর মেলা বন্ধ করা কতটা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটিও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ করদাতাদের অভিযোগ, আয়কর জমা দিতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। আর এ ভোগান্তির কারণেই কর প্রদানযোগ্য উপার্জনকারীরা আয়কর দিতে উৎসাহবোধ করেন না। 

ফলে বিশালসংখ্যক মানুষ আয়করের বাইরে থেকে যাচ্ছে, এতে উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেমন অর্থসংকট তৈরি হচ্ছে, তেমনি বৈদেশিক সাহায্যের ওপরও নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আয়করদাতার সংখ্যা কম হলেও প্রতি বছর বাংলাদেশে বাজেটের আকার ও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে। এজন্য করযোগ্য উপার্জনকারীদের শনাক্ত করে তাদের কাছ থেকে কর আহরণে পদক্ষেপ নিতে হবে।

মূলত কর দেয়ার জন্য সচেতনতা তৈরিতে এনবিআরকে কাজ করতে হবে। কিন্তু স্বেচ্ছায় কর দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক ব্যবসায়ীর মধ্যে ভীতি বা অনীহা কাজ করে—এটিও ধরে নেয়া হয়। কর দেয়া যে সুনাগরিকের দায়িত্ব এ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। এজন্য এনবিআরের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোকেও কাজ করতে হবে।

আয়কর আহরণে ঘাটতি রেখে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে অপ্রত্যক্ষভাবে কর গ্রহণে সমাজে বৈষম্য তৈরি হয়। এছাড়া কর ঠিকমতো আহরণ না হলে কালো টাকা তৈরি হয়ে সেটি পাচার হয়ে যায়। এজন্য কর আহরণে স্বচ্ছতার পাশাপাশি করের টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করব, কর আহরণে এনবিআর আরো গতিশীল ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারসহ স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এনবিআরের দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।