ড. সায়মা হক বিদিশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নীতি সুদহার, খেলাপি ঋণ, রিজার্ভ পরিস্থিতি, সরকারি ব্যয়, বৈদেশিক শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, হুন্ডি, অর্থ পাচারসহ দেশের অর্থনীতির সার্বিক সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম

দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতিকে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়ানোর পরও কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে?

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে আর্থিক নীতি এবং এর পাশাপাশি রাজস্বনীতি ও সার্বিক প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মতান্ত্রিকতার বিষয়গুলো জরুরি। চলমান এ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে আমাদের সব টুল একসঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। কারণ এখন সার্বিকভাবে বিষয়গুলো ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। 

এক্ষেত্রে আপনি যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন সেটি হচ্ছে আর্থিক নীতি। এখন আর্থিক নীতিতে সুদের হার বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি কমার কথা। কিন্তু আমরা সে বিষয়টি দেখছি না, এর কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় জড়িত। যেমন আমরা সংকট কাটিয়ে ওঠার যে পদ্ধতিগুলো নিয়েছি সেটা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে ফল দেবে না। এর জন্য সময় লাগবে। কারণ আমাদের অর্থনীতি পরিপূর্ণ বাজার অর্থনীতির মতো একদম কার্যকরভাবে কাজ করে না। 

দ্বিতীয়ত, মুক্তবাজার অর্থনীতির চর্চা অনুসারে চিন্তা করলে সাধারণত পশ্চিমা দেশগুলোয় নীতি সুদের হারকে টুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তারা এ পদ্ধতিতে ভালো ফল পায়। আমরা কেন পাচ্ছি না? দুটো কারণ বলব। একটা হচ্ছে, এ নীতি তখনই ভালো ফল দেবে যখন দেশের সব খাতে মুক্তবাজার অর্থনীতির নিয়ম যথাযথভাবে পালন হবে। বিশেষ করে মনিটারি অ্যাগ্রিগেটে যখন সুদহার, ক্রেডিট ও বিনিময় হার ভালোভাবে কাজ করবে তখন আমরা ভালো ফল পাব। সেটা আমাদের দেশে নেই। বিনিময় হারে তো নেই, এছাড়া ৬ মাসের ট্রেজারি বিলের সঙ্গে সমন্বয় করে সুদহার রাখা হয়েছে। সুতরাং, বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে কত হতো সেটা আমরা জানি না। অর্থাৎ কোথাও আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করছি আবার অন্য জায়গায় এ নিয়ম মানছি না। ফলে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল মিলছে না, আংশিক ফল পাওয়া যাচ্ছে। 

তৃতীয়ত, নীতি সুদহারের মতো কার্যকর রিফ্লেকশন পেতে হলে অন্যান্য জায়গায়ও ফ্লেক্সিবিটি দরকার, সেটি আমাদের নেই। আমরা যদি মনিটারি বা ফিসক্যাল পলিসির সব টুল শতভাগ ব্যবহার করি, তার পরও কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাবে যে মূল্যস্ফীতি তাত্ত্বিকভাবে পরিবর্তন হচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট সমস্যাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। এক্ষেত্রে বাজার অবকাঠামো সঠিকভাবে কাজ করবে যদি বাজারে পূর্ণাঙ্গ প্রতিযোগিতা সচল থাকে। এখানে গুটি কয়েক বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজার কুক্ষিগত হয়ে আছে।  

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে সাপ্লাই চেইন যেভাবে সচল থাকার কথা সেভাবে মানা হচ্ছে না। অবৈধভাবে পণ্য মজুদ করে মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এ কারণে চাইলেও মনিটারি ও ফিসক্যাল টুল পলিসির শতভাগ সুফল নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আমরা পুরোপুরিভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতির আলোকে প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। এজন্য ভালোভাবে বাজার তদারকি করতে হবে। ব্যাপারটা এমন নয় যে একদিন বাজারে গিয়ে দু-একজনকে জরিমানা করা হলো। পরে দেখা যাবে যে আবার যেমন আছে তেমনই হয়ে যাবে। এভাবে করলে হবে না। এটা রেগুলার বেসিসে কম্প্রিহেনসিভ ওয়েতে করতে হবে।

ব্যাংকে খেলাপি ঋণের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে লাগাম টেনে ধরার উপায় প্রসঙ্গে বলুন।

খেলাপি ঋণের বিষয়টি তো আর একদিনে হয়নি, এটা বহু বছর ধরে হয়েছে। এক্ষেত্রে লাগাম কোনোভাবেই টানা যাচ্ছে না, বরং কভিডের সময় শিথিলতার সুযোগ নেয়া হয়েছিল। এরপর দেখা যাচ্ছে যে পুনঃতফসিলীকরণসহ বিভিন্ন ফাঁকফোকর দিয়ে বড় বড় ঋণ খেলাপি বের হয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট উদ্যোক্তা ঋণখেলাপি হলে ধরা হয়, কিন্তু বড় বড় ঋণখেলাপি অধরা রয়ে যায়। 

ঋণখেলাপির বিষয়টা ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে হবে, আগে যারা ঋণখেলাপি ছিল তারা যেন পরবর্তী সময়ে আর ঋণ না পায় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে। কেননা কোনটা খেলাপি ঋণ আর কোনটা খেলাপি নয়—এ বিষয় নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তৃতীয়ত, আমাদের দেশে অর্থ ঋণ, অর্থ আদালত খুবই ধীরগতিতে কাজ করে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকে এ ব্যাপারে কথা বলেছি, তারা দ্রুতই এ বিষয়গুলো সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছে। 

আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকলেও সরকারি ব্যাংকগুলো অর্থ বিভাগের অধীনে, অথচ সব ব্যাংকই বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে পরিচালিত হলে ব্যাপারগুলো সহজ হয়।

চতুর্থত, একজন উদ্যোক্তার ঋণ ১০ লাখ টাকা, আবার একজন শিল্পপতির ঋণ ১০ কোটি টাকা। আমরা তাদের একভাবে শাস্তি দিতে পারি না। এখানে একটা থ্রেশল্ড ঠিক করা যায়। এ রকম নির্দিষ্ট লেভেলের থ্রেশল্ডের ওপর কড়াকড়ি করতে হবে। যেমন খেলাপি ঋণ যদি এত বেশি হয় তাহলে ভবিষ্যতে আর কোনো ঋণ পাবে না, আদালতের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি হবে। সামাজিকভাবে বিভিন্ন বিষয় মোকাবেলা করা লাগবে, বিদেশে যেতে পারবে না। বিষয়টা হচ্ছে, এখানে বড় বড় যারা ব্যবসায়ী আছেন তাদের বহু বছর ধরে খেলাপি ঋণ আছে, তারা বিভিন্নভাবে পার পেয়ে যাচ্ছেন। তারা যেন আর ছাড় না পান। খেলাপি ঋণের সঙ্গে এখন আরেকটি বিষয় আছে, সেটা হলো বিভিন্নভাবে টাকাটা প্রবাসে সেকেন্ড হোমে নিয়ে যাচ্ছে। এটি বন্ধ করতে হবে। যা খুব একটা সহজ নয়, তার পরও ব্যাংকিং রেগুলেশন বিশেষ করে ব্যবসা সম্পর্কিত ওভার-ইনভয়েসিং, আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ে কড়াকড়ি করলে এটা সম্ভব। 

রিজার্ভ ক্রমশ কমছে, এক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতিতে কী ধরনের ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

আমাদের রিজার্ভ বেশি থাকাটা ম্যাক্রো পার্সপেক্টিভে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রিজার্ভের এ পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না। এজন্য কয়েকটা বিষয় জড়িত, একটা হচ্ছে রেমিট্যান্সে আমরা প্রণোদনা দিচ্ছি, প্রণোদনার ফলে হয়তো এক-দুই মাসের মধ্যে একটু বাড়বে। তারপর আবার একই জায়গায় ফিরে যাবে। এর কারণ হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রেরণকারীরা দেখবেন যে খোলাবাজারে বেশি দাম পাচ্ছেন তখন তারা কেন আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে যাবেন? বাংলাদেশে তারা এ দাম দিয়ে দু-তিন মাসের জন্য সুবিধা করতে পারবেন; এর বেশি নয়। আরেকটা হলো, অবৈধ চ্যানেলের একটা বাজার আছে, অর্থাৎ প্রবাসীরা টাকা পাঠাতে চাচ্ছেন এটা শুনে হুন্ডিওয়ালারা বলে—সরকার এত টাকা দিচ্ছে, আমি আরো বেশি দিব। যদি আপনি ইউনিফায়েডও করে ফেলেন তাও আরো বেশি টাকা দেয়ার কথা বলবে। সুতরাং ওই টাকাটা যে হুন্ডিওয়ালারা নিচ্ছে, এ টাকা কিন্তু বাংলাদেশে প্রবেশ করছে না। সমস্যাটা এখানে, টাকা যেহেতু দেশে প্রবেশ করছে না, এখন তাহলে আমরা কী করতে পারি। আমাদের দেখতে হবে হুন্ডির সোর্সটা কী, হুন্ডিওয়ালারা যে টাকাটা বাংলাদেশী টাকায় পরিবারগুলোকে দিচ্ছে, এক্ষেত্রে দেখতে হবে টাকাগুলো কোথা থেকে আসছে। প্রকৃতপক্ষে এই যে টাকাটা আসছে, তাতে কিছু মানুষ তাদের কালো টাকা সাদা করছে। কিছু মানুষ বিদেশে টাকাগুলো দিয়ে সেখান থেকে ডলার নিতে চাচ্ছে। মূলত ব্যবসার মাধ্যমে টাকাগুলো দেশের বাইরে আদান-প্রদান হয়। এজন্য ব্যবসা সম্পর্কিত ইনভয়েসিং খুব শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক খাতের নিয়মগুলো প্রতিপালনে আরো কড়াকড়ি করতে হবে, এখানেও থ্রেশল্ডের কথা বলব। দেখা যাচ্ছে, আমরা আমদানিতে অনেক বিধিনিষেধ করছি, কিন্তু বড় দু-একটা আমদানির মধ্যে সেই টাকাগুলো চলে যাচ্ছে। তাই একটা নির্দিষ্ট অ্যামাউন্টের ওপর যখনই কোনো ধরনের ট্রানজেকশন আসবে, সেক্ষেত্রে খুব শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। হুন্ডি বন্ধ না হলেও কমানোর কাজটিই করতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো, বিনিময় হার বাজারের হাতে ছাড়তে হবে। কিন্তু এটা আজ বললেই আগামীকাল ছেড়ে দেয়া সম্ভব নয়। সেটা সময় নিয়ে করতে হবে, আমাদের সে রকম অবকাঠামো আছে কিনা দেখতে হবে। ধাপে ধাপে ওই দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকতে হবে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমরা অভিযোগ দেখি, যেটুকু আমদানি দেখানো হচ্ছে, যতগুলো যন্ত্রপাতি আমদানি হচ্ছে, শিল্পায়ন সে হারে হচ্ছে না। এখানে যে তথ্য দেয়া হচ্ছে, সে তথ্যে ফাঁক আছে কিনা যাচাই করতে হবে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কৃচ্ছ্রসাধন। এ কথা আমরা বারবারই বলছি। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনুযায়ী সাবধানে থাকতে হবে এবং দেখতে হবে অতিরিক্ত খরচ যাতে না হয়। অতিরিক্ত আমদানিও যাতে না হয়। আমদানির ক্ষেত্রে ছোট ছোট আউটফ্লোর ক্ষেত্রে তদারকি করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের বড় বড় আউটফ্লো চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের মধ্যে রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি থেকে এখন আরেকটা জিনিস দেখতে হবে যে এখন আমাদের ফিসক্যাল সাইডেও অনেক কিছু করণীয় রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাবলয় ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে। ওএমএসের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। ওএমএসে আরো খাদ্যপণ্য যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে আরো ভর্তুকি দিতে হবে। আর এ টাকা জোগানের জন্য অন্যান্য জায়গায় কৃচ্ছ্র সাধন করতে হবে। বড় প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে এখন একটু সাবধান হতে হবে। এ মুহূর্তে ছোট প্রকল্পগুলোয় আমাদের মনোযোগ থাকা দরকার। অবশ্যই সরকারি ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকারি ব্যয় কোন জায়গায় হচ্ছে সেটি বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমরা হয়তো আমদানি শুল্কে কিছুটা কাটছাঁট করে মানুষকে মূল্যস্ফীতি থেকে একটু সুবিধা দিতে পারি। এ পদ্ধতি অনুসরণ করা অনেকদিন ধরেই জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখনই হোক এটা করতে হবে। 

এখন অর্থনীতিতে সঠিক নীতির আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি বারবার উঠে আসছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন নির্বাচন কেন্দ্র করে এটি কি দোদুল্যমান অবস্থায় আছে?

এটি স্বাভাবিক যে নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় শিল্পপতিরা খুব সাবধানে আছেন। তারা খুব বেশি টাকা খরচ করছেন না। সরকারও হয়তো বড় ধরনের সংস্কারে যাবে না। এমন কিছু করবে না যেটার প্রতিফলন নির্বাচনে পড়ে। তার পরও এর একটা প্রভাব পড়বে। সুতরাং দেখা যাবে যে বড় ধরনের উদ্যোগ বা সংস্কার সরকার করতে চাইবে না। বড় সংস্কার করতে না চাওয়াকে আমি অস্বাভাবিকও বলব না। কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে স্বল্পমেয়াদে আমাদের কী করতে হবে? এ সময়ে ব্যাপকভাবে নিরাপত্তাবলয় বাড়াতে হবে। আর যেটা আগে বলেছি, বাজার তদারকির ক্ষেত্রে ছোট উদ্যোগ নিলে চলবে না, বড় উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু ছোট উদ্যোক্তাদের ধরলে হবে না, বড় ব্যবসায়ীদের ধরতে হবে। যারা সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের কারসাজি করছে তাদের ধরতে হবে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, দেখা যায় যে খাদ্য, কৃষি, বাণিজ্য এ মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। যদিও এগুলোর সমন্বয়টা জরুরি। কতটুকু কী পণ্য আমদানি করা হবে, আমদানির সময় এসব তথ্য খুব জরুরি। 

ওমান সাময়িকভাবে ভিসা দেয়া বন্ধ করেছে। দেশটির সিদ্ধান্ত আমাদের রেমিট্যান্সের ওপর প্রভাব ফেলবে কিনা?

আমরা রেমিট্যান্স বলতে মধ্যপ্রাচ্য আর রফতানি বলতে গার্মেন্টসকে বুঝি। এই যে ওমান ভিসা বন্ধ করল এটি নিশ্চয়ই হঠাৎ করে দেখা যায়নি। এর সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট, তারা নিশ্চয়ই বহু দিন ধরে টের পাচ্ছিলেন এটা বন্ধ করে দিতে পারে। তখন সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন ছিল, ওমান ভিসা না দিলে কী করণীয়? বিকল্প খুঁজতে হতো। এই যে স্টেরিওটাইপ চিন্তা— মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ায় অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মানুষ পাঠাব। কিন্তু এ চিন্তা থেকে বের হয়ে যদি দেখার চেষ্টা করি যে নতুন খাতগুলো কোথায়? আমাদের একটা বড় খাত কিন্তু কেয়ার ইকোনমি। যেমন জাপান, দেশটিতে বয়স্করা অনেক বেশি। পশ্চিমা দেশগুলোয় বয়স্কদের জন্য কেয়ার গিভার লাগে। শিশুদের জন্য সেবিকা লাগে। এ দেশগুলোর জন্য হয়তো ভাষা শিক্ষার দরকার হবে। এটা চার-পাঁচ মাসের প্রশিক্ষণেই সম্ভব। এখন কাতার, কুয়েত, সৌদি আরবের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের ট্যাগ করে দিচ্ছে। এ জায়গাগুলোয় এখন একটা দেশ যেকোনো সময় ভিসা বন্ধ করে দিতেই পারে। সে কারণে বিকল্প দেশ, খাত ও কাজ দেখতে হবে।

নারী শ্রমিকদের প্রায় অর্ধেকের মরদেহ দেশে ফেরত আসে না বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানো শ্রমিকদের প্রতি এ ধরনের অবহেলার প্রতিকার কী?

আমাদের কূটনৈতিক শক্তি সেভাবে নেই। এতদিনে আমাদের এটা তৈরি হওয়া দরকার ছিল। এক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে আমাদের বোঝাপড়া বাড়ানো এবং শক্ত অবস্থান নেয়া দরকার।

অর্থনীতির অনেক সংকট নিয়ে কথা হলো, এবার সম্ভাবনার কথা বলুন।

মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ এ দুটো ক্ষেত্রে স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া দরকার এবং কয়েকটা মেজর ফান্ডামেন্টাল জায়গায় প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। যেমন সরকারি ব্যয় এবং ব্যাংক খাত। এগুলোয় যদি আমরা বড় সংস্কার আর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলে এ ধরনের সমস্যা আর থাকবে না। সেই কারণে দীর্ঘমেয়াদি ভিশন নিয়ে যদি আমরা পরিকল্পনা নিই এবং স্বল্পমেয়াদে রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতি এ দুটোকে মোকাবেলা করতে পারি তাহলে স্পষ্টত অনেক সুযোগ রয়েছে। তবে এ সুযোগগুলোর মধ্যে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। আর অগ্রাধিকারটা যদি রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতির আলোকে ঠিক করা যায় তাহলে সেটা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে। একটা ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে, কভিডের মতো বড় সংকট আমরা ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পেরেছি। এর কারণ হলো, আমাদের যতই খারাপ পরিস্থিতি হোক না কেন মানুষ তার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। অ্যাডাপ্টিবিলিটি বা খাপ খাইয়ে নেয়ার যে ক্ষমতা আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে খুব বেশি। এটাই আমাদের বড় শক্তি। সে কারণে কভিডের সময় যখন চাকরি চলে গেছে তখন মানুষ ছোটখাটো ব্যবসার উদ্যোগ নিয়েছে, অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছে, খাবার সরবরাহ করছে কিংবা কোনো না কোনোভাবে কাজ খুঁজে নিয়েছে। একইভাবে মূল্যস্ফীতি যখন হচ্ছে—এটার দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা আছে, তার পরও মানুষ কিন্তু মানিয়ে ‍নিচ্ছে। হয়তো ডিমটা কম খাচ্ছে, অন্য খাবার কম খেয়ে হলেও খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। সুতরাং এই খাপ খাইয়ে নিয়ে সামনের দিকে যাওয়ার যে অভ্যাস এটা আমাদের বড় শক্তি। এ কারণে আমরা রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার কথা ভাবতে পারি। তবে আমরা নিশ্চয়ই আশা করি না যে রাতারাতি মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনব। আর রিজার্ভটা অন্তত একটা সম্মানজনক অবস্থায় যদি রাখা যায়। তাহলে আমরা মোটামুটিভাবে সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারব। আমাদের সুযোগগুলোর মধ্যে এটা একটা বড় সুযোগ যে এসএমই বা এমন ছোটখাটো খাত রয়েছে। যেহেতু আমাদের মানুষ বেশি, সে হিসাবে আমাদের একটা বড় মার্কেটও আছে। দেশের বাজারে আগে অনলাইনে খাবার সরবরাহ এতটা পরিচিত ছিল না। কভিডের মধ্যে এটা জনপ্রিয় হলো, তারপর অনেক মানুষ এ ব্যবসা দিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছে। আমাদের অনেক মানুষ আছে, এটাকে নেতিবাচকভাবে না দেখে মানুষকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ আছে। এ সুযোগ বাংলাদেশের মানুষ এতদিন ব্যবহার করে এসেছে। সে কারণেই বলছি, এগুলো আমাদের আশার দিক। যে কারণে অতীতের সংকট আমরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। এবারো আমরা পারব, এজন্য অর্থনীতির মৌলিক জায়গাগুলোয় শক্তিশালী থাকতে হবে।