ডায়াবেটিস একটি বিপাকজনিত সমস্যা। রক্তের গ্লুকোজ বেড়ে গেলে সাধারণত এ রোগ হয়ে থাকে। বংশগত কিংবা পারিপার্শ্বিক কারণে শরীরে ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণ কমে গেলে বা এর কার্যক্ষমতা কমে গেলে কিংবা দুইয়ের মিলিত প্রভাবেও এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এটি জন্মগত ও খাদ্যাভ্যাসের কারণেও হতে পারে। শুধু প্রাপ্তবয়স্করাই নয়, বাংলাদেশে শিশুরাও এখন ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তবে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাই বেশি। ফলে শিশুর স্বাভাবিক জীবন যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে তেমনি টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে। এজন্য শিশুদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেয়া উচিত। নানা কারণে দেশে শিশুদের ডায়াবেটিস বাড়ছে। সময় পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে জীবনযাপনের পদ্ধতি। ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের ফলে খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ জেলা শহরগুলোয় ভাড়া বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাটে পরিচালনা করা হচ্ছে স্কুল। সেখানে নেই খেলার মাঠ ও শিশুর মানসিক বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ। শিশুদের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ছে। পরিবর্তন এসেছে খাদ্যাভ্যাসেও। পাঠ্যক্রমও বাড়াচ্ছে শিশুদের অত্যধিক মানসিক চাপ। এসব কারণে শিশুদের শরীরচর্চা কিংবা শারীরিক পরিশ্রম অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। ফলে শিশুরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিনের সহজলভ্যতা নিশ্চিতের পাশাপাশি দরকার সচেতনতা বাড়ানো। এর কুফল সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণাও বাড়াতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। টেলিভিশনের পাশাপাশি পাঠ্যবইয়েও ডায়াবেটিস প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে জোর দেয়া দরকার। সব বয়সের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে হবে।

দেশে দিন দিনই বাড়ছে ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। পেডিয়াট্রিকস ডায়াবেটিক ক্লিনিক অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের (পিডিসিআরসি) তথ্য অনুসারে, বর্তমানে ৭ হাজার ৪২৫-এর মতো শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এর অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৫৩ শতাংশই আবার ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের। ২০১০ সালের পর থেকে গত বছর পর্যন্ত বিভাগ দুটিতে ৪ হাজার ৬৩৯ শিশুর দেহে রোগটি ধরা পড়েছে। ঢাকা বিভাগে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৩ হাজার ৩৯৯ ও চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার ২৪০। এছাড়া রংপুর বিভাগে ৮৯৭, রাজশাহীতে ৫৭৮, ময়মনসিংহে ৪৮৫, খুলনায় ৪৬২, বরিশালে ২৯২ ও সিলেট বিভাগে ৭২ শিশুর দেহে ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। জেলাভিত্তিক সবচেয়ে বেশি ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে ঢাকায়, ১ হাজার ৬৮২ শিশুর দেহে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, শিশু-কিশোরদের ডায়াবেটিস মূলত দুই ধরনের। প্রথমত, শরীরে ইনসুলিন তৈরি না হওয়া, যাকে বলে টাইপ-১ ডায়াবেটিস। দ্বিতীয়ত, ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা কমে যায়, যার নাম টাইপ-২ ডায়াবেটিস। শিশুদের টাইপ-১ ডায়াবেটিসের উপসর্গ দেখা দেয় তুলনামূলক কম বয়সে। আক্রান্ত শিশু দিন দিন শুকিয়ে যায়, ঘন ঘন প্রস্রাব করে আর দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে, এমনকি রক্তে শর্করা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় কিটোসিস হয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস একটু বেশি বয়সের শিশু বা কিশোর-কিশোরীদের দেখা যায়। যাদের ওজন বেশি, শরীরে অতিমাত্রায় মেদ, কায়িক পরিশ্রম করে না, তাদের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

তবে উভয় ক্ষেত্রেই কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য এ রোগ হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া বিভিন্ন হরমোনের অসামঞ্জস্য বা কিছু ওষুধের কারণেও ডায়াবেটিস হতে পারে। টাইপ-১ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে আগে থেকে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, দৈনন্দিন কায়িক পরিশ্রম ও নিয়ন্ত্রিত জীবন চালনার অভ্যাসের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রেখে টাইপ-২ ডায়াবেটিস অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

পিডিসিআরসি বলছে, দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুর ৮৭ শতাংশই টাইপ-১ আক্রান্ত। বাকি ১৩ শতাংশ বা ১ হাজার ১৬৭ শিশু টাইপ-২ আক্রান্ত। তবে টাইপ-১ শিশুর ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রেই আক্রান্তের কারণ জানা যায়নি। মাত্র ১০ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে টাইপ-১ আক্রান্তের কারণ জানা গেছে। সাধারণত ভাইরাল ইনফেকশন ও জন্মের তিন মাসের মধ্যে গরুর দুধ সেবন—এ দুই কারণে শিশুদের এ ধরনের ডায়াবেটিস হয়।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুকে ইনসুলিনের ওপর নির্ভর করেই সারা জীবন কাটাতে হয়। দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের অনেকেই দরিদ্র পরিবারের শিশু। তাই দীর্ঘ সময় ধরে সন্তানের ইনসুলিনের খরচ চালিয়ে যাওয়া বাবা-মায়ের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় ২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট প্রথমবারের মতো বিনামূল্যে ইনসুলিন দেয়া হয়েছিল। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এ সেবা পায় রোগীরা। কিন্তু গত জুন থেকে সরকারের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অর্থায়ন বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছে অভিভাবকরা। ফলে বিনামূল্যে কেবল ইনসুলিন বিতরণ নয়, পুরো কর্মসূচির কার্যক্রমই স্থবির হয়ে পড়েছে। দরিদ্র পরিবারের শিশুর জীবন সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে বিনামূল্যে ইনসুলিন প্রদান কার্যক্রম চালু করা দরকার।

শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে এখনই সবাইকে সতর্ক হতে হবে। খাদ্যাভ্যাসসহ শরীরচর্চায় জোর দিতে হবে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস যেহেতু প্রতিরোধযোগ্য সেজন্য দরকার জীবনযাপনে ও অভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কায়িক পরিশ্রম, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস, সবুজ শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। শৈশবে যারা ওজনাধিক্য ও স্থূলতায় ভোগে, তাদের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। সঠিক পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সচেতন করে তুলতে হবে। বর্জন করতে হবে ফাস্ট ফুড, কোমলপানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য। বাড়িতে তৈরি পুষ্টিকর খাবার ও টিফিনে তাদের অভ্যস্ত করা প্রয়োজন। প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবারের প্রতি উৎসাহী করতে হবে। প্রতিদিন নিয়ম করে খেলাধুলা বা কায়িক শ্রম করা জরুরি। সেজন্য স্কুলে, পাড়ায়, শহরের আবাসিক এলাকায় খোলা মাঠ ও পার্ক বা শিশুদের খেলার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সবাইকে এখনই এ রোগ প্রতিরোধে সচেতন হতে হবে। তা না হলে শিশুদের জীবন হুমকিতে পড়বে।