আধুনিক সময়ে ব্যাংকের ঋণপত্র প্রক্রিয়াকে কাটিয়ে আমদানি কিংবা রফতানি করার বিকল্প সমাধান আছে। হ্যাঁ, লেনদেনটা ব্যাংকিং চ্যানেলে করতে হয়। ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি (নো ইউর কাস্টমার, গ্রাহক তথ্যব্যাংক) বা ই-কেওয়াইসি নামে কিছু ইউরোপীয়-মার্কিন ফিনটেক অ্যালায়েন্স কোম্পানি আছে, যারা ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় ও পেমেন্ট সংযোগ তৈরি করে।
বাংলাদেশের আইনে বাধা থাকায় সরাসরি ই-কেওয়াইসি বাণিজ্যে যাওয়ার সাহস করেন না ভালো রফতানিকারকরা। এলসি বিকল্পের পাশাপাশি ই-কেওয়াইসি কোম্পানিগুলো ‘এক্সপোর্টার ফাইন্যান্সিং’ করে, যেটা বাণিজ্য বিকাশে খুবই উপকারী। এক্ষেত্রে রফতানিকারক শিপিং ডকুমেন্ট আপলোড করলেই ই-কেওয়াইসি শিপমেন্ট ভেরিফাই করে অতিদ্রুত (মাত্র এক সপ্তাহে) রফতানি আয়ের বড় অংশ পাঠিয়ে দেয়, এজন্য এলসি নিষ্পত্তি পর্যন্ত বা ১২০ দিন অপেক্ষা করতে হয় না। অর্থাৎ ই-কেওয়াইসি বিক্রেতাকে পেমেন্ট করে (স্বল্পমেয়াদি ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) পরে ওই ডলার ক্রেতার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। পাশাপাশি এসএমই খাতের ছোট, কিন্তু মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদকরা, যারা ব্যাংকের এলসি সাপোর্ট পান না, ই-কেওয়াইসি অ্যালায়েন্স তাদের ব্যাপক উপকারে আসে।
এসব ফিনটেক কোম্পানি ও তাদের পার্টনাররা ক্রেতা ও বিক্রেতার সুবিশাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি করে (ট্রেড অ্যান্ড ফাইন্যান্স, প্রডাকশন, শিপিং ইত্যাদিতে)। গ্রাহক শনাক্তকরণ, অনবোর্ডিং বা ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, কমপ্লায়েন্স, আগের আমদানি ও রফতানি এলসির ডাটাবেজ তৈরি, অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং সম্মতি আইন পূরণ, আর্থিক জালিয়াতি শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ ও মোকাবেলা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিগ-ডাটা, মেশিন লার্নিং এবং ব্লকচেইনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে। অর্থাৎ এরা ইলেকট্রনিক লেনদেনে চরম পর্যায়ে সক্ষম। অনেক ক্ষেত্রে তারা সাধারণ মুদ্রার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকার অনুমোদিত ফিনটেক ক্রেডিট, ক্রিপ্টো মুদ্রাও ব্যবহার করে।
ফিনটেক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যাংক, ফাইন্যান্সিয়াল হাউজ, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি, শিপিং ও ফরওয়ার্ডিং, ম্যানুফ্যাকচারিং, বায়ার, কাঁচামাল রফতানিকারক, পণ্য উৎপাদক কোম্পানি, বায়িং হাউজ কিংবা বন্দর ইত্যাদি বহুবিধ ডোমেইনের কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কৌশলগত অংশীদারত্ব থাকে। গ্রাহকদের জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং সর্বোচ্চ মানের ই-কেওয়াইসি সমাধান প্রদানের ফ্রেমওয়ার্ক থাকে। যার ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সমাধান অফার করে এবং বিশ্বস্ত পরিচয় যাচাইকরণ সমাধানগুলোকে আরো অ্যাকসেসযোগ্য করে তোলে। যদিও ধারাটা নতুন ও বিকাশমান। তবু এটা ব্যাংকের এলসি কিংবা ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সেবার একটা বিকল্প হতে চলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এসব কোম্পানি ই-কমার্স ক্ষেত্রে দুর্দান্ত সাফল্য পেয়েছে, এখন তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্প্রসারণ করতে শুরু করেছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা গ্রাহক শনাক্তকরণ এমন পর্যায়ে নিয়েছে যে ‘আগে কিনে পরে অর্থ প্রদানের’ সেবা দিতে শুরু করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রক নীতিমালা কেমন হবে? বাংলাদেশে কি ই-কেওয়াইসি অ্যালায়েন্সভুক্ত রফতানিকারক বা আমদানিকারক আছে? উত্তর হচ্ছে, বাংলাদেশের কিছু কোম্পানি এই ফ্রেমওয়ার্কে পরীক্ষামূলক যুক্ত আছে। ই-কেওয়াইসি অ্যালায়েন্সভুক্ত রফতানিকারক বা আমদানিকারক দেশে আছে, কিন্তু সরকারের কোনো নীতিমালা নেই। ফলে মাঝে মধ্যে দেখা যায়, আমদানি ঋণপত্র ছাড়াই বন্দরে পণ্য আসে, এতে সবাই অবাক হয়। যদিও দুর্নীতির উর্বর দেশে অনেক কিছুই সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংককে ই-কেওয়াইসি নীতিমালা করতে হবে, ফিনটেক ক্রেডিটের ভবিষ্যৎ মাধ্যম নিয়ে ভাবতে হবে। ব্যাংক এলসির নতুন ও দক্ষ বিকল্প নিয়ে গবেষণা করতে হবে। ভবিষ্যৎ রফতানির নতুন সরবরাহ ব্যবস্থায় নিজেকে ইন্টিগ্রেট করার রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও সচেতন হতে হবে। কোম্পানিকে আন্তর্জাতিক আমদানি-রফতানির নতুন ধারায়, ই-কেওয়াইসি অ্যালায়েন্সে যুক্ত হতে হলে আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং এবং রফতানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং করে পাচারের চর্চা থেকে দূরে থাকতে হবে। কেননা ফিনটেক অ্যাপ্লিকেশন প্রযুক্তিতে যেকোনো পণ্যের অতীত ও বর্তমানের আন্তর্জাতিক বাজারদর ডাটাবেজে থাকবে, এলসি রেকর্ড থাকবে। খুব দূরে যেতে হবে না, গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির তথ্যশালায় বাংলাদেশের এলসির বিপরীতে অর্থ পাচারের রেকর্ড আছে। রফতানির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির অমিল, রফতানি পণ্যের বিপরীতে রফতানি আয়ের অমিল অর্থাৎ, মানি লন্ডারিংসহ যেকোনো পাচার ও চুরি সহজেই ধরা পড়ে যাবে। অতীতে জালিয়াতি করে, সময়ে ভালো হয়ে যাওয়া কোম্পানিও আগের ডাটার অ্যানালাইসিসে ধরা খেয়ে অ্যালায়েন্সভুক্ত হতে ব্যর্থ হতে পারে।
জাল তথ্য ও কোলেটারাল দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এবং ব্যবসায়ীরা অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্মার্ট চুক্তি কিংবা অপরাপর ডিজিটাল ইনোভেশন কিংবা ফিনটেক সেবার বিকাশের পথ রুদ্ধ করছেন। এই যে জামানত, ঠিকানা, ক্রেডিট রিপোর্ট, ব্যবসার তথ্য যাচাই ছাড়া, অর্থাৎ কেওয়াইসি কমপ্লায়েন্স ছাড়াই দেশের ব্যাংকগুলো একের পর এক বেনামে যোগসাজশে ঋণ দিচ্ছে, এতে তারাও ভবিষ্যতে ই-কেওয়াইসি অ্যালায়েন্সে যুক্ত হতে অযোগ্য হবে। পাশাপাশি জালিয়াতিসহায়ক দুর্বল রেগুলেশনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকেরও ডিজিটাল ক্রেডিবিলিটির সূচক খারাপ হবে। সব মিলিয়ে আজকের চুরি, পাচার, এলসি জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং, ভুয়া বাণিজ্যিক গ্রাহক কেওয়াইসি, দুর্বল রেগুলেশন ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্ভাবনার ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনে অযোগ্যতা তৈরি করছে। অর্থাৎ নিজের অজান্তেই ব্যাংক ও ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ ভবিষ্যৎ চুরি করছেন।
ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্ভাবনার দুয়ার খোলা রাখতে একদিকে যেমন দেশের বন্দর ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণে পলিসি রোডম্যাপ দরকার, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদেরও পাচার থামিয়ে প্রকৃত ব্যবসায় মনোযোগ দেয়া দরকার।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব: প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ










