ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়ছে না। গত বছর যখন ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়, তখনো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী ছিল। চলতি বছর আমদানি শুল্ক রেয়াত শেষ হওয়ার পর ভোজ্যতেলের দাম আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়ার পর ট্যারিফ কমিশনের পক্ষ থেকে এ মূল্যবৃদ্ধি অনুমোদন পায়। এক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে ট্যারিফ কমিশন আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে শুধু ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্য ও দাবি আমলে নিয়েছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, উৎপাদন খরচ, মোড়কজাত, অপচয় (প্রসেস লস), মুনাফা ও ডিলার কমিশন মিলিয়ে আরো ১৫ শতাংশ যুক্ত করে সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসাব করেও দেখা যায়, খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৮৩ টাকা ৫০ পয়সার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ট্যারিফ কমিশনের অনুমোদন নিয়ে বাজারে খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে এখানে ব্যবসায়ীরা অতিমুনাফা করার সুযোগ পাচ্ছেন। সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ে। এক্ষেত্রে ভোক্তাদের স্বার্থ না দেখে শুধু একতরফাভাবে ব্যবসায়ীদের কথা শোনা হলে বাজার অস্থিতিশীল হওয়া খুব স্বাভাবিক। এজন্য বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। 

গত বছরের মার্চে ভোজ্যতেলের বাজারে উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ও ব্যবসায়িক পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট স্থগিত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি উত্থাপন করলেও সরকার ১০ শতাংশ ভ্যাট স্থগিত করে। ফলে দেশে ভোজ্যতেল আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন পর্যায়ে ভ্যাটের মোট হার মাত্র ৫ শতাংশে নেমে আসে। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিলের পর ভ্যাটের ওপর স্থগিতাদেশের এ সময়সীমা আর বাড়ানো হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীদের ভোজ্যতেল আমদানির ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ ভ্যাট প্রদান করতে হচ্ছে। কিন্তু এ শুল্ক ও পরিশোধন ব্যয় হিসাবের পরও দেখা যায়, এর চেয়ে অনেক বেশি দামে সয়াবিন তেল-পাম অয়েলসহ আমদানীকৃত সব ধরনের ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে। অথচ বিশ্ববাজারে কয়েক মাস ধরে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় অর্ধেকে নামলেও শুল্ক পুনর্বহালের কারণ দেখিয়ে দেশে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। অধিকন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য যখন কম ছিল, তখন শুল্ক সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ীরা এতদিন অধিক মুনাফা করেছেন। দাম কমানোর কোনো পদক্ষেপও দৃশ্যমান হয়নি। সে হিসেবে বর্তমান সময়েও অতিরিক্ত মুনাফা করা হলে তা কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্ন কিন্তু থেকে যায়। এজন্য নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ট্যারিফ কমিশনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

মূলত ভোজ্যতেলের মূল্য নির্ধারণ একটি চলমান প্রক্রিয়া, এক্ষেত্রে যেন স্থিতিশীলতা বজায় থাকে সেটি নির্ধারণ করা জরুরি। কারণ তেল প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য হওয়ায় এর ওপর নির্ভর করে অন্যান্য খাবারের দামও বৃদ্ধি পায়। তাই ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে তেলের মূল্য নিয়ে যেন অস্থিতিশীলতা তৈরি না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। আর ট্যারিফ কমিশন শুধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে তেলের মূল্য নির্ধারণ করে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ অভিযোগের সমাপ্তি দরকার। মূল্য সমন্বয়ের আলোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ভোক্তাদের প্রতিনিধিও রাখা উচিত। সেটি না করে শুধু আমদানিকারকদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে মূল্য সমন্বয়ের কথা বলে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়া হয়। এতে একতরফাভাবে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা হলেও সার্বিকভাবে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এক্ষেত্রে ট্যারিফ কমিশনের ভাষ্যমতে, ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইনবন্ড, এক্সবন্ড ও এলসি (ঋণপত্র) মূল্যের গড় হিসাব করে আমদানি মূল্য হিসাব করা হয়। এরপর উৎপাদন পর্যায়ের ভ্যাট, উৎপাদন পর্যায়ে অবচয়, পরিশোধন খরচ, মোড়কজাত, আমদানিকারকের মুনাফা, ডিলার কমিশন, খুচরা বিক্রেতার মুনাফা ইত্যাদি হিসাব করে ভোক্তা পর্যায়ের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করার দাবিও তারা করে। অন্যদিকে বিভিন্ন কোম্পানির দেয়া আমদানি, পরিবহন, পরিশোধন, বাজারজাতের খরচ পর্যালোচনা করে একটি নিরপেক্ষ মূল্য প্রস্তাব করার বিষয়টি ট্যারিফ কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

শুধু ব্যবসায়ীদের তথ্যকে প্রাধান্য দেয়া হয় না দাবি করা হলেও পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশে ভোজ্যতেলের মূল্যের পার্থক্য থাকায় আমদানিকারকরা লাভবান হন। কিন্তু সাধারণ বিক্রেতা ও ভোক্তারা ভোজ্যতেল ক্রয়ে ঠকছেন। এদিকে কোনো আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান যদি ভুল তথ্য দেয়, সেটিও অনুসন্ধানের মাধ্যমে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এবং ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে ট্যারিফ কমিশন দাবি করেছে। এছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত পদ্ধতিতে পণ্যমূল্য নির্ধারণ করায় ট্যারিফ কমিশনের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই বলেও ট্যারিফ কমিশন আত্মপক্ষ সমর্থন করে থাকে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। দেশের পাইকারি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এক্ষেত্রে আমদানিকারকদের অতিমুনাফা নিয়ে আপত্তিও জানানো হয়েছে। আর বস্তুত ভোজ্যতেল এমন এক প্রয়োজনীয় দ্রব্য, যা অবিক্রীত থাকে না। ফলে তেল নষ্ট হওয়ারও কোনো কারণ নেই। কিন্তু তার পরও প্রক্রিয়াগত ক্ষতির কথা বলে ব্যবসায়ীরা তেলের দাম বাড়ান এমন অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফাকেই তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে দায়ী করা হচ্ছে। এজন্য ভোক্তার স্বার্থ রক্ষার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। মোদ্দা কথা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যই ভোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়। এজন্য ভবিষ্যতে মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ট্যারিফ কমিশন যেন ভোক্তাদের স্বার্থ যাচাই করে, আমরা সে প্রত্যাশাই করি। এক্ষেত্রে যদিও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিশ্ববাজারে মূল্য কমার প্রভাব সামনে পড়বে বলা হচ্ছে, এখন এ কথার যেন ব্যত্যয় না ঘটে সেটি সঠিকভাবে মনিটরিং করা দরকার। সর্বোপরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক ভূমিকায় ভোজ্যতেলের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক—সেটিই আমাদের কাম্য।