বাংলাদেশের গণপরিবহন খাত এখনো জনগণের আপন হয়ে উঠতে পারেনি। পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল খাতের একটি আমাদের গণপরিবহন খাত। যাত্রীদের ভোগান্তি, ব্যয়, দুর্ঘটনা ইত্যাদি মিলে গণপরিবহনে বড় ধরনের কোনো উন্নতি ঘটেনি। এ ব্যর্থতার পেছনে বড় দায় রয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন বা বিআরটিসির। গণপরিবহনে ভোগান্তি দূর করতে মাঝে মাঝে ভালো উদ্যোগ নেয়, নতুন নতুন বাস যুক্ত করে কিন্তু অযত্নে-অবহেলায় সেগুলোর স্থান হয় ভাগাড়ে। একই অবস্থা পণ্য পরিবহনের জন্য কেনা ট্রাকের। বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের পেছনে অন্যতম প্রভাবকের মধ্যে রয়েছে উচ্চ পরিবহন ব্যয়। বিআরটিসি যদি তুলনামূলক কম খরচে পণ্য পরিবহন করে দিত তাহলে কৃষক থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতারা অনেক উপকৃত হতেন। কিন্তু তিন বছরের মধ্যেই ৫০০ ট্রাকের বেহাল দশা আমাদের বেহাল গণপরিবহন ব্যবস্থাকেই সামনে তুলে এনেছে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, সাশ্রয়ী ভাড়ায় দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনসেবা দিতে বছর তিনেক আগে দুই প্যাকেজে মোট ৫০০টি ট্রাক কেনে বিআরটিসি। এতে সব মিলিয়ে খরচ হয় ১১৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ভারতের আইশার মোটরস লিমিটেডের কাছ থেকে কেনা ট্রাকগুলো এরই মধ্যে নষ্ট হওয়ার পথে। মরিচা পড়ে ছিদ্র হয়ে গেছে এর বডি। অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের কারণে অনেকগুলোর বডি ভেঙে গেছে। দুর্বল ইঞ্জিন কয়েক দিন পরপর মেরামতে খরচ বাড়ছে বিআরটিসির। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। 

জানা গেছে, দুই প্যাকেজে ২০১৯ সালে ভারত থেকে ৫০০ ট্রাক কেনে বিআরটিসি। এর মধ্যে একটি প্যাকেজে কেনা হয় ৩৫০ ট্রাক, যেগুলোর প্রতিটিরই পণ্য পরিবহনের ধারণক্ষমতা ১৫ টন। এর জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ১২৫ কোটি টাকা সংস্থান ছিল। সে হিসাবে প্রতিটি ট্রাকের পেছনে গড়ে ৩৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা (খুচরা যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক সেবা এবং আমদানি শুল্ক ও ভ্যাটসহ) জোগান দেয় সরকার। যদিও সেগুলো কিনতে বিআরটিসি খরচ করেছে ৭৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এ হিসাবে প্রতিটি ট্রাকের পেছনে গড়ে ২১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়। দ্বিতীয় প্যাকেজে কেনা হয় ১০ টন ধারণক্ষমতার ১৫০টি ট্রাক। প্রতিটির জন্য গড়ে ৩১ লাখ টাকা ধরে ডিপিপিতে সংস্থান ছিল ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ট্রাকগুলো কিনতে যদিও ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা খরচ করেছে বিআরটিসি। সে হিসাবে প্রতিটির দাম পড়েছে ১৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ ডিপিপিতে যে পরিমাণ অর্থের সংস্থান ছিল, দুটি প্যাকেজেই তার চেয়ে অর্ধেক দামে ট্রাকগুলো কেনা হয়েছে। নতুন কেনা ৫০০ ট্রাকের ২০৬টি বর্তমানে আছে বিআরটিসির ঢাকা ডিপোয়, চট্টগ্রাম ডিপোয় রাখা হয়েছে ২৭৬টি। বাকিগুলো রয়েছে বিআরটিসির ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে। 

‘‌বিআরটিসির জন্য ট্রাক সংগ্রহ’ প্রকল্পটির ওপর সম্প্রতি একটি সমাপ্ত প্রকল্প মূল্যায়ন (পিসিআর) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আইএমইডি। গাড়িগুলো পর্যবেক্ষণ করে সংস্থাটি বলছে, এগুলোর ইঞ্জিন ও বডি অনেক দুর্বল। বেশির ভাগেরই বাহ্যিক অংশ এরই মধ্যে ছিদ্র হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে মালপত্র পরিবহন করলে ভিজে যায়। সব মিলিয়ে বিআরটিসির কেনা ৫০০ ট্রাককে নিম্নমানের বলে আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

আইএমইডি বলছে, সংস্থানের চেয়ে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা কম দামে কেনা হলেও ট্রাকগুলো নিম্নমানের। অথচ বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে উন্নত মানের ট্রাক কেনা যেত। তাতে এসব গাড়ির স্থায়িত্ব যেমন বাড়ত তেমনি সরকারের কোষাগারেও অর্থ আসত। 

নতুন ও পুরনো মিলিয়ে বিআরটিসির বহরে বর্তমানে ট্রাক রয়েছে ৫৯০টি। পণ্য পরিবহন করে ২০২২-২৩ অর্থবছর সংস্থাটি ১৭১ কোটি টাকা আয় করেছে। সচল ট্রাক দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সার, কৃষি উপকরণ, খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, কাগজসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদে পরিবহনসেবা দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়সহ দেশের বিভিন্ন দুর্যোগ ও আপৎকালে এসব ট্রাক দিয়ে সাশ্রয়ী ভাড়ায় পণ্য পরিবহনে ভূমিকা রাখতে পারে বিআরটিসি।

দেশের বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের ঘাটতিতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়। বিআরটিসির বাস-ট্রাক ক্রয়ে এ ধরনের খামখেয়ালিপনা দেখা যায়। যে উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়েছিল তার জন্য যদি ভালো মানের ট্রাক ক্রয় করা হতো তাহলে দীর্ঘদিন সেগুলোর সেবা পাওয়া যেত। চতুর্মুখী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ রকম অপচয় কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সরকারের পণ্য ক্রয় ও দরপত্র আহ্বানে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়া চাই। অযথা অতিরিক্ত দামে যেমন পণ্য কেনা উচিত নয়, তেমনি কম দামে বাজে পণ্য কেনাও ভালো সিদ্ধান্ত নয়। তিন বছরেই ৫০০ ট্রাক নষ্ট হওয়ার পথে চলে যাওয়া আমাদের ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকেই জানান দিচ্ছে।