মানবাধিকার ও পরিবেশ নিয়ে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সুবাদে বিরূপ আবহাওয়ার নজিরবিহীন পুনরাবৃত্তিতে ভয় পাচ্ছি। একটি করে দিন পার হয় আর প্রমাণিত হয়, আমরা তীব্র জলবায়ু সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। অতীতের দুর্যোগগুলো আমাদের জীবনে ঐশী রহস্যে পরিণত হয়েছে।
উগান্ডা, ইরিত্রিয়া, জিবুতি, ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ায় বন্যা এবং খরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে। হাজারো মানুষ মারা গেছে ও লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সাম্প্রতিক বন্যা লিবিয়ার শহরগুলো গ্রাস করেছে। এটা শুধু প্রকৃতির আচরণের ফলে হচ্ছে এমনটি নয়। আমরা জানি, অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে জীবাশ্ম জ্বালানি পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন বিপর্যয়কর পরিণতি নিয়ে এসেছে। আমরা অবিরতভাবে জ্বালানি পোড়াচ্ছি।
কিন্তু দক্ষিণ ফ্রান্সে সাম্প্রতিক জলবায়ু আন্দোলনে দেখা যায়, জলবায়ুকর্মীরা নদীর শুষ্ক ভূমিতে ফরাসি তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি টোটালএনার্জিসের প্রতি নিন্দা জানিয়ে স্লোগান তুলেছেন। এটি কঠোর সতর্কবার্তা, যা আমাদের বর্তমান দুর্দশা তুলে ধরে। উদাহরণ হিসেবে ধনী রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপের কথা উঠে আসে। যারা কিনা বিশ্বের অধিকাংশ কার্বন নিঃসরণে জড়িত।
এক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো প্রকৃতপক্ষে দোষী। যারা পৃথিবীর সব সম্পদ হস্তগত করেছে এবং সাধারণ মানুষকে তাদের পণ্যের ফাঁদে ফেলেছে। সর্বোপরি তেল কোম্পানিগুলো ১৯৭০-এর দশক থেকে পরিবেশের ওপর তাদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব সম্পর্কে জানে। কিন্তু তারা এসব ধামাচাপা দেয়ার কৌশল বেছে নিয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দেয়া তাপমাত্রা এবং অভূতপূর্ব যেসব বিপর্যয় আমরা বিশ্বজুড়ে দেখছি এগুলো এসবের পরিণতি।
বৈশ্বিক উষ্ণতা থামাতে আমাদের অবশ্যই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো ও এর ওপর নির্ভরতা পরিহার করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেল ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জোর দিয়েছে যে অবিলম্বে জীবাশ্ম জ্বালানি অনুসন্ধান বন্ধ করা এর একমাত্র সমাধান।
এটি পরিষ্কার যে নিঃসরণ কমানোর জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার প্রয়োজন হলে আমাদের দুর্ভোগ বাড়বে। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। সম্প্রতি বিধিসম্মতভাবে এক্সনমবিল জোর দিয়ে বলেছে, শূন্য কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যে ‘এটি অত্যন্ত অসম্ভব উপায়। কারণ মানুষ জীবনযাপনের কাঙ্ক্ষিত মানের অবনমন মেনে নেবে না’। তাদের কার্যক্রমের বিপর্যয়কর প্রভাব সম্পর্কে ভালোভাবে জানানোর পরও এসব কোম্পানি ৫৬ বিলিয়ন ডলার লভ্যাংশ রক্ষার্থে জলবায়ুবিজ্ঞানীদের উপেক্ষা করেছে। এর মধ্যে এক্সনমবিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ৩৬ মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছেন। উগান্ডায় স্থানীয় সম্প্রদায়ের ফসলের ক্ষয়ক্ষতি ও কৃষিভূমি বন্যার দূষিত পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও টোটালএনার্জিসের তিলেঙ্গা প্রকল্প গত বছর ৩৬ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছে।
এ কারণে ফ্রান্সের নদী রক্ষা আন্দোলনের স্লোগান খুব আলোচিত হচ্ছে, ‘যদি সুপেয় পানি না থাকে, তাহলে তারা তেল পান করুক।’ এটি একটি প্রবল সমবেত আর্তনাদ। গত কয়েক দশকে তেল কোম্পানিগুলোর অসংযত ও বেপরোয়া আচরণ ফ্রান্সের বিদ্রোহ-পূর্ববর্তী উদ্দীপনাকে ছাপিয়ে যায়। যেভাবে অভিজাততন্ত্র ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঠেকিয়েছিল। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারকারী শিল্প-কারখানাগুলো ক্ষমতা এবং প্রভাব ছাড়তে অনিচ্ছুক। কীভাবে তাদের খামখেয়ালি অন্যদের বিপদে ফেলছে, সেটা তারা মনেই করছে না।
শিল্প-কারখানাগুলোর দাবির বিপরীতে বাস্তবতা হচ্ছে, শূন্য কার্বন নিঃসরণ জীবনযাপনের মান কমাবে না। এমনকি কেউ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারে হঠাৎ বিরতি দেয়ার জন্যও বলছে না। জলবায়ু মডেলগুলো দেখিয়েছে উত্তম সমাধান হচ্ছে নতুন অনুসন্ধান নিষিদ্ধ করা এবং অধিক কার্যকর একটি পদ্ধতিতে ধাবিত হওয়া, যা বিদ্যমান রিজার্ভের সামান্য অংশ ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরে। যাতে অবকাঠামো নির্মাণ করার সময় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির মধ্য দিয়ে বর্তমান জীবনযাপনের মান বজায় রাখা যায়।
সবুজ জ্বালানি কোনো আপস নয়, এটি প্রতিশ্রুতি। অনেকগুলো পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা আমাদের বাড়ি, অফিস, শহর ও শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর শতকোটি জনগণের জন্যও প্রযোজ্য। এ পরিবর্তন কয়েক লাখ নতুন চাকরির দরজা খুলবে। বাতাস ও পানির মান উন্নত করবে। জলবায়ু পরিবর্তনকে সহনীয় করে তুলবে। এছাড়া আবহাওয়ার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি কমাতে সংশ্লিষ্ট দেশ ও সমাজকে উৎসাহিত করবে।
এটা নিশ্চিত যে জ্বালানিতে এ বিনিয়োগ একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রক্রিয়ার সমন্বয় করা আবশ্যক। বারবাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী মিয়া আমর মটলির ব্রিজটাউন ইনিশিয়েটিভ ধারণার কথা বলা যেতে পারে। যেমন বিশ্ব অর্থনীতির নকশায় বড় ধরনের সংস্কার করা। সম্প্রতি নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা জলবায়ু সম্মেলনের আহ্বানের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সেখানে বৈশ্বিক কার্বন কর আরোপের কথা বলা হয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেসের আরেকটি ধারণার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি। পাশাপাশি রয়েছে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং এক্টিভিস্টদের নানা তত্ত্ব। যেমন জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ এবং জীবাশ্ব জ্বালানি কোম্পানির ওপর কর বসানো। যেহেতু বিশ্ব নেতারা আগামী নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের (কপ২৮) প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে এ প্রস্তাব সদয় বিবেচনার দাবি রাখে। এ চিন্তা জারি রাখা যে দূষণকারী বিশ্ব মোড়ল রাষ্ট্রগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নৈতিক বিচারযোগ্য এবং আর্থিক সংবেদনশীল।
আজকের বহু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে জলবায়ু আন্দোলন খুব কম মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। কিন্তু আমি আশাবাদী, এ শক্তিশালী মতবাদ অন্য সব কিছুর মধ্যে অনুরণন তুলবে।
সব শেষে যে কথাটা বলতে চাই, এ পৃথিবী আমাদের একমাত্র আবাসভূমি। জলবায়ু পরিবর্তন একে অস্তিত্বের হুমকিতে ফেলেছে। একে রক্ষা করা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো বিকল্প নেই।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ডিকেন্স কামুগিসা: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, আফ্রিকা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি গভর্ন্যান্স
ভাষান্তর: তৌফিকুল ইসলাম










