সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট ‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স ২০২৩’ শীর্ষক এক বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের ভয়ংকর তথ্য উপস্থাপন করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশে পরিণত হয়েছে। এ বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু কমে যাচ্ছে প্রায় ৬ দশমিক ৮ বছর অর্থাৎ প্রায় সাত বছর। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এলাকাভেদে এ পরিস্থিতি আরো বেশি ভয়াবহ।
বিশ্বের সর্বত্রই বায়ুদূষণের ফলে মানুষের আয়ু কমে যাচ্ছে। তবে গবেষণায় উল্লেখ করা আছে যে পৃথিবীর ছয়টি দেশে সবচেয়ে বেশি দূষিত বায়ু উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে – বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন, নাইজেরিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।
ছোটবেলায় বইয়ে পড়েছিলাম ‘বায়ুদূষণের সংজ্ঞা’। বায়ুদূষণের জন্য তখন দায়ী করা হতো ইটভাটাকে, যানবাহনে দূষিত ধোঁয়াসহ ইত্যাদিকে। তবে এখন শিল্প-কলকারখানার ধোঁয়া, অতিরিক্ত যানবাহনের ধোঁয়াও অন্যতম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশও উন্নত হচ্ছে। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প ও ছোট-বড় আবাসন প্রকল্পের নির্মাণকাজের ব্যবস্থা বাড়িয়েছে বায়ুদূষণকে। অর্থনীতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এতে করে বেড়েছে ধনীদের ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা, যা এখন ইচ্ছা করলেও পথে আর লাগাম টানা যাচ্ছে না।
গ্রামাঞ্চলেও উন্নয়নের হাওয়া লেগেছে। তাই সেখানে আর আগের মতো তেমন মাটির উনুন চলে না; চলছে গ্যাসের চুলা। তাহলে গাছে মরা পাতাগুলো যাচ্ছে কোথায়? শহরাঞ্চলে দেখা যায় গাছের মরা পাতা জড়ো করে এক জায়গায় নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এতেও তো বায়ুদূষণের সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ শহর ও পৌর এলাকায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এ কারণে আগুন দিয়ে সেই বর্জ্য পুড়ানো হচ্ছে। এতে বায়ুদূষণ ক্রমেই বাড়ছে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আমাদের দেশে বায়ুদূষণের মূল উৎস ইটভাটা ও যানবাহন। বাংলাদেশের অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার ৫৮ শতাংশ আসে ইটভাটা থেকে। চমকে যাওয়ার মতো বিষয়, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে তিন গুণ। নির্মাণকাজের জন্য সৃষ্ট ধুলাবালি, ফসলের খড় পুড়ানো এবং শিল্প-কারখানার ধোঁয়া বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। উল্লেখ্য, এ ধোঁয়া দক্ষিণ এশিয়ার এক দেশ থেকে অন্য দেশেও প্রবাহিত হচ্ছে।
বায়ুদূষণের প্রভাব বেশ দীর্ঘমেয়াদি। বায়ুদূষণে বিদ্যমান অতিক্ষুদ্র কণা এতটাই ক্ষুদ্র যে তা চোখে দেখা যায় না। তাই অতি সহজেই এটি আমাদের চোখ, নাক ও মুখ দিয়ে সরাসরি আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। এতে ফুসফুস, হার্ট, কিডনি, লিভার আক্রান্ত হয়ে থাকে। বায়ুদূষণ যেকোনো বয়সী মানুষের জন্য ক্ষতিকর। গর্ভবতী নারী, শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি এবং প্রবীণদের জন্য এ বায়ুদূষণ মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে।
চলুন, মানবদেহে বায়ুদূষণের প্রভাব জেনে নিই –
১) বায়ুদূষণের কারণে মানুষের প্রজনন স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, প্রজনন স্বাস্থ্যকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে এ বায়ুদূষণ। এর কারণে নারীদের ডিম্বাণু অতিরিক্ত পরিমাণে কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, পুরুষের শুক্রাণু তৈরিতেও ব্যাঘাত ঘটছে। এতে করে শুক্রাণুর মান দিন দিন নিচের দিকে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ, জন্মগত ত্রুটি, গর্ভপাত এগুলোয় বায়ুদূষণ বড় ধরনের প্রভাব ফেলে বলে জানা গেছে।
২) মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে এ বায়ুদূষণ। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় উঠে এসেছে – বাংলাদেশের যেসব স্থানে বায়ুদূষণ বেশি সেই এলাকাগুলোর ১৪ শতাংশ বাসিন্দা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত; যা কম দূষণ আক্রান্ত এলাকার চেয়ে বেশি।
৩) শুনলে আশ্চর্য হতে হয় যে বায়ুদূষণের কারণে মানুষের বুদ্ধিও লোপ পাচ্ছে। এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে তীব্র বায়ুদূষণের সঙ্গে মানুষের বুদ্ধি কমে যাওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে। গবেষণাটি চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যৌথভাবে এবং গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল চীনে।
৪) বর্তমানে বায়ুদূষণের সঙ্গে মানবদেহে ডায়াবেটিস রোগের সম্পর্কও দেখতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
৫) চিকিৎসকদের মতে, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন, বিভিন্ন যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে সহজেই মিশে যাচ্ছে। এ বিষাক্ত ও ক্ষতিকর পদার্থগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে যাচ্ছে। এতে করে ক্ষতগ্রস্ত হচ্ছে ফুসফুস। আবার রক্তের সঙ্গে মিশে চলে যাচ্ছে হৃৎপিণ্ডে। দীর্ঘদিন ধরে যদি এসব ক্ষতিকর পদার্থ মানবদেহে প্রবেশ করে তবে ফুসফুস, লিভার, কিডনি ও হৃৎপিণ্ডে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে। পরিণামে দেখা যায়, বিভিন্ন অঙ্গ বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে এবং শেষ পরিণতি হিসেবে বায়ুদূষণের শিকার মানুষটিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়।
৬) শিশুদের মস্তিষ্ক বিরূপ প্রভাব ফেলছে এ বায়ুদূষণ। কিছু কিছু পদার্থ আছে যা শিশুদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এগুলো যখন সরাসরি শিশুদের মস্তিষ্কে চলে যায়, তখন তাদের মস্তিষ্কের গঠন ঠিকভাবে হয় না। এতে করে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
৪) উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকা নারীদের উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
৫) গর্ভাবস্থায় বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকা নারীদের রক্তে বিষাক্ত রাসায়নিকের মাত্রা বেড়ে যায়। এর পরিণতিতে তা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে। দূষিত বায়ু যখন ভ্রূণে পৌঁছে তখন কম ওজনবিশিষ্ট শিশু বা সময়ের আগেই শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে শিশুর স্থায়ী স্নায়বিক সমস্যা, যেমন শেখার ঘাটতি এবং নিম্ন বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ বায়ুদূষণের ফলে অ্যালঝেইমার নামক রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।
৬) বায়ুদূষণের ফলে মানুষের ত্বকেরও ক্ষতি হয়। এর ফলে ত্বকে অকাল বার্ধক্য, ত্বকের ক্যান্সার, ত্বকে জ্বালা এবং প্রদাহের কারণ হতে পারে এ বায়ুদূষণ।
৭) বায়ুদূষণের ফলে মানুষের হতে পারে সর্দি-কাশি। যখন অতিসূক্ষ্ণ কণাগুলো মানুষের ফুসফুসের ভেতরে চলে যায় তখন এটি সংক্রমণের কারণ হতে পারে। আবার এটি প্রদাহেরও কারণ হতে পারে যা শ্বাসকষ্ট তৈরি করে। এ বায়ুদূষণের কারণে মানুষের সিওপিডি এবং হাঁপানির ঝুঁকি বেশি থাকে।
বায়ুদূষণের ফলে আমাদের দেহের যথেষ্ট ক্ষতি হচ্ছে। আমরা আগেই জেনেছি যে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট (এপিক) গবেষণায় উঠে এসেছে যে বায়ুদূষণের ফলে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় সাত বছর কমছে; যা খুবই উদ্বেগজনক। বায়ুদূষণ কমানো না গেলে এর ভয়াবহ মাশুল গুনতে হবে আমাদের সবাইকে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বায়ুদূষণ বন্ধ করা যেতে পারে কীভাবে? আমার কয়েকটি মতামত আসুন দেখে নেয়া যাক –
১) সুস্থভাবে বাঁচতে মানুষের জন্য এখন প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ অক্সিজেনের। এ অক্সিজেনের জোগান দিতে পারে গাছপালা। অনেকে আছেন যারা নির্বিচারে গাছ কাটেন কিন্তু গাছ লাগান না; এটি অনুচিত। একটি গাছ কাটলে সেই স্থানে দুটি গাছ লাগাতে হয়। কিন্তু এ নিয়ম অনেকেই মানেন না। নিজের আঙিনার খালি জায়গায় গাছ লাগান। ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকলে নিজের বারান্দায় গাছ লাগান; ছাদ বাগান করুন।
২) ধুলোবালি থেকে দূরে থাকতে মাস্ক ব্যবহার করুন। করোনা প্রতিরোধেও মাস্ক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি।
৩) নিজের বাড়িঘর এবং আশপাশের জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। রাস্তাঘাটে মাঝে মাঝে পানি ছিটাতে হবে, যাতে করে ধুলোবালি না ওড়ে।
৪) কলকারখানা ও ইটভাটা শহর থেকে দূরে স্থাপন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে যদি ধোঁয়া কমানো সম্ভব হয় তবে সেই দিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে।
৫) ফসলের খড়, গাছের পাতা, বর্জ্যদ্রব্য পুড়ানো বন্ধ করতে হবে। এ ধোঁয়াও বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ।
৬) রাস্তায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। এর কালো ধোঁয়া ব্যাপক পরিমাণে বায়ুদূষণের সৃষ্টি করে।
৭) রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা অত্যধিক পরিমাণে থাকে। গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে রাস্তায় দৈনিক বের হওয়া ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমাতে হবে। উল্লেখ্য, এখন থেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে লাগান টানতে হবে সরকারকে।
বাংলাদেশের জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সবাই সুস্থ থাকতে এবং সবাইকে সুস্থ রাখতে এ পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।
প্রীতি রাহা, ময়মনসিংহ।










