সাহারা মরুভূমির আলজেরীয় অংশে একটি খাড়া পাথরের ঢালে উঠতে গিয়ে এক পর্যটক যখন হিমশিম খাচ্ছেন, এমন অবস্থায় বাবা আতানফ ওই নারী পর্যটকক জিজ্ঞেস করেন—লাবেস? অর্থাৎ, আপনি ঠিক আছেন তো? অবশ্য সেই নারী তখন জবাব দেয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। আতানফ তখন তার ক্যামেরার ব্যাগটা তুলে নেন। এর আগেই ওই নারীর ছোট ব্যাকপ্যাকটাও নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন তিনি। একটু হালকা হয়ে পর্যটক আবার উঠে দাঁড়ান।
পর্যটকদের নিয়ে যিনি এগিয়ে চলেছেন, তিনি ৫৭ বছর বয়সী বাবা আতানফ। গত তিন দশক ধরে গাইড হিসেবে এই পার্বত্য মরুভূমিতে পর্যটকদের সঙ্গ দিচ্ছেন তিনি। বলা চলে এই মরুভূমির প্রতিটি পথ তার চেনা।
এই মরুভূমি আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ আলজেরিয়ার ৮৩ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত। এক স যেখানে প্রবেশ করা ছিল কঠিন, এখন সেটাই পর্যটনের নতুন দিগন্ত হয়ে উঠছে। ১৯৬২ সালে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটার পর দীর্ঘ সময় আত্মনির্ভরতা বজায় রেখেছিল আলজেরিয়া। এখন এই সাহারা অঞ্চলে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রীয় মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
সাহারার বুকে ৫০ হাজার বর্গমাইল জুড়ে এক বিশাল বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক বিস্ময় তাসিলি ন’আজ্জের ন্যাশনাল পার্ক। পার্কের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে আদিম শিলাচিত্র, প্রাগৈতিহাসিক জীবনের সাক্ষ্য। আর এই অঞ্চলে পর্যটন শিল্পের বিকাশে আতানফের মতো গাইডদের সহায়তায় কাজ করছে ‘তুয়ারেগ ভয়াজেস’ নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সি। বিদেশীদের জন্য সাহারায় ভ্রমণকে সহজ করতে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আলজেরিয়া সরকার চালু করেছে অন অ্যারাইভাল ভিসা, যা মালয়েশিয়া, সেশেলস এবং পাঁচটি মাঘরেব দেশের নাগরিক ছাড়া সব বিদেশীর জন্য প্রযোজ্য। একই বছরের ডিসেম্বর থেকে প্যারিস ও মরু শহর জেনাতের মধ্যে চালু হয়েছে সরাসরি বিমান পরিষেবা। এখন মাত্র ৩০ দিনের মধ্যেই, নির্ধারিত ফি দিয়ে (৩৮ থেকে ৩৭৬ ডলার), একপ্রকার নিশ্চয়তার সঙ্গেই মিলছে ভিসা। ফলে পর্যটক সংখ্যা বাড়ছে রেকর্ডহারে। ২০২৩ সালে দেশটি প্রায় ৩৩ লাখ পর্যটক পেয়েছে, যার মধ্যে ২২ লাখই ছিলেন বিদেশী। আলজেরিয়ার পর্যটন ও হস্তশিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রবৃদ্ধি ৪৪ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে এক বছরের ব্যবধানে। লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখে পৌঁছানো।
তাসিলি ন’আজ্জের পার্ক শুধু মরুভূমি নয়, এটি এক বিশাল খোলা জাদুঘর। এখানে মাটির লাল-হলুদ প্রাকৃতিক রঙে আঁকা প্রায় ১৫ হাজার শিলাচিত্র ছড়িয়ে আছে ১০ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কাল ধরে। কখনও গরু, কখনও উট, কখনও মানুষের নৃত্য— প্রাচীন শিল্পকলার সুষ্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় এগুলোর মধ্যে।
পর্যটকরা যখন উচ্চভূমির পাথুরে জঙ্গল ধরে এগিয়ে চলেন, আতানফ কখনও পাথরের ওপর উঠে মোটরবাইক চালানোর ভঙ্গি করেন, আবার কখনও হাজার বছরের পুরনো জীবাশ্ম দেখান—সবকিছুর মাঝে রয়ে যায় তার রসবোধ ও সরলতা। তিনি যখন লাল পাথরের টুকরো ঘষে রঙ বের করে বলেন— ‘প্রাচীন যুগের মেকআপ।’ তখন সবাই যেন ফিরে যান সময়ের পেছনে, আদিম মানবের কাছে।
এই যাত্রা মোটামুটি ৭৫ মাইল ট্র্যাকিংয়ের। নেই বিদ্যুৎ, ওয়াইফাই, বাথরুম বা আধুনিক আরাম-আয়েশ। তবে প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর খাবার, বিশুদ্ধ বাতাস, নীরবতা আর পর্যাপ্ত ঘুম এই অভিজ্ঞতাকে এক রকম ডেজার্ট স্পা বানিয়ে তোলে।
মরুভূমির নিস্তব্ধতার মধ্যে প্রতিটি ভোরে যখন আজানের সুর ভেসে আসে, তখন পর্যটকের সাময়িক হলেও যাযাবর মন উদাস না হয়ে পারে না। মরুভূমির নিস্তরঙ্গ নীরবতা নিয়ে কেউ কেউ বলেন, এই নীরবতাই এক ভাষা, যেখানে যেকোনো কথাও হয়ে ওঠে অসামান্য।
তাসিলির জগত ছাড়িয়ে আলজেরিয়া নিজেই এক সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ—নিউলিথিক থেকে রোমান, আরব থেকে ফরাসি। উত্তরাংশে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী রাজধানী আলজিয়ার্স, প্রাচীন রোমান শহর, পাহাড়-টিলা, সমুদ্রসৈকত—সব একসঙ্গে মিশে আছে। তবে সাহারা হলো আত্মার আবাস। তাসিলির গিরিখাত পেরিয়ে পর্যটকরা যখন এর্গ আদমের উপত্যকায় পৌঁছান, যেখানে শত শত ফুট উঁচুতে ওঠে বালির ঢেউ, সেখানে প্রকৃতির বিশালতার কাছে মানুষের ক্ষুদ্রতা অনুভব করা যায়।










