প্রতিদিনকার ব্যস্ততা থেকে যে ক্লান্তিবোধ কাজ করে তা কিছুটা কমানো যেতে পারে বাগানের সংস্পর্শে এসে। কিন্তু সংকীর্ণ পরিবেশে আবাসনের কারণে বাড়ির একটি অংশে সবুজের আবরণ তৈরি অনেকের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় ফলের গাছ লাগানো কল্পনার বাইরের বিষয়। তবে সমস্যাটির সমাধান রয়েছে। ফলের গাছ লাগানোর জন্য বড় বাগান বা জায়গার প্রয়োজন নেই। একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে বাড়ির ছোট্ট বারান্দা বা দেয়াল ঘেঁষেই ফলানো সম্ভব নানা জাতের ফল। বিশেষ কৌশলটির নাম হলো ‘এসপালিয়ার’।
এসপালিয়ার হলো একটি বিশেষ কৌশল, যার মাধ্যমে গাছকে কোনো দেয়াল বা বেড়ার সঙ্গে সমান্তরালে বেড়ে ওঠার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ফরাসি শব্দটি এসেছে এমন একটি ধারণা থেকে, যেখানে কোনো কিছুকে কাঁধের ওপর ভর দিয়ে দাঁড় করানো বোঝানো হয়। তাই এ কৌশল অনুসরণ করে তৈরি বাড়তে থাকা গাছগুলো দেখতে অনেকটা জীবন্ত ভাস্কর্যের মতো সুন্দর দেখায়।
কৌশলটির জন্ম সপ্তদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে। রাজা চতুর্দশ লুইয়ের বাগান পরিচর্যাকারীরা দেখেছিলেন, ভার্সাইয়ের ঠাণ্ডা ও ঝড়ো আবহাওয়ায় ফলের গাছ টিকে থাকতে পারে না। তখন তারা একটি উপায় বের করেন। গাছকে দেয়ালের সঙ্গে লাগিয়ে বাড়তে দেয়া, যাতে দেয়াল গাছের জন্য একটি বাতাসরোধী ঢাল ও তাপ সংরক্ষকের কাজ করে। এতে গাছ ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পেত। পদ্ধতিটি শুধু ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাত তাই নয়, গাছগুলো সূর্যের আলোও বেশি পেত এবং বেশি ফল দিত।

কৌশলটি প্রয়োগ করে স্বল্প জায়গায় অধিক ফল পাওয়া সম্ভব, ছবি: এপি
কৌশলটি প্রাচীন মিশর ও মধ্যযুগেও প্রচলিত ছিল বলেও ধারণা করা হয়, কিন্তু ভার্সাইয়ের বাগান পরিচর্যাকারীরাই এর নামকরণ করেন, বিশ্বজুড়ে এটিকে বিখ্যাত করে তোলেন।
আপেল, চেরি, ডুমুর, পিচ, পেয়ারা, প্লাম ও কুইন্সের মতো লম্বা ও নমনীয় ডালপালা আছে এমন যেকোনো গাছ এসপালিয়ারের জন্য উপযুক্ত। এমনকি, ম্যাগনোলিয়া, ফায়ারথর্ন বা উইচ হ্যাজেলের মতো শোভাময় গাছগুলোও এ পদ্ধতিতে লাগানো যায়।
এসপালিয়ার পদ্ধতিতে গাছকে সঠিক আকার দিতে প্রয়োজন ধৈর্য ও পরিচর্যা। গাছ যখন ছোট থাকে, তখন এর অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছেঁটে ফেলতে হয় এবং বাকিগুলোকে তারের ফ্রেম বা দেয়ালের সঙ্গে বেঁধে সাবধানে বড় হতে দেয়ার জন্য রাখতে হয়।
এ পর্যায়ে গাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য উচ্চ-নাইট্রোজেনযুক্ত সার বসন্তের মাঝামাঝি, গ্রীষ্মের শুরুতে ও গ্রীষ্মের শেষের দিকে তিনবার দিতে হবে। এ সময়ে গাছে ফুল বা ফল আশা করা উচিত নয়। কারণ সার প্রয়োগের উদ্দেশ্য হলো শক্তি যুগিয়ে কেবল কেবল বৃদ্ধি করানো, ফল উৎপাদন নয়। যখন গাছ পছন্দমতো আকার পেয়ে যাবে, তখন নির্দিষ্ট সার বছরে বসন্তকালে একবার দিতে হবে।
তবে এ পদ্ধতিতে একটি সমস্যাও দেখা দিতে পারে। দেয়ালের সঙ্গে চেপে থাকার কারণে গাছের চারপাশে বাতাসের চলাচল কমে যায়, ফলে পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত গাছ পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত সমাধান করা জরুরি।
পরিশেষে, সঠিকভাবে গাছের যত্ন নিলে অল্প কয়েক বছরেই বাড়ির দেয়ালে জীবন্ত ভাস্কর্য যেমন তৈরি করা সম্ভব, একইভাবে নিজ হাতে পেড়ে ফলও উপভোগ করা যাবে। - এপি অবলম্বনে










