১৯৯০ সালে চীনের হুবেই প্রদেশে আবিষ্কৃত একটি প্রাচীন মানব খুলি তিন দশকের বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রে ছিল। কারণ, এটি ফসিল হওয়ার প্রক্রিয়ায় এতটাই বিকৃত হয়েছিল যে এর আসল আকৃতি বা গুরুত্ব নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা দেখিয়েছে, এই খুলিটি সম্ভবত মানুব জাতির বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার প্রাচীন সদস্য। যা হোমো স্যাপিয়েন্স-এর বিবর্তনের সময়রেখা নতুন করে লেখার মতো তথ্য দিচ্ছে।
গবেষকরা উন্নত স্ক্যানিং ও ডিজিটাল পুনর্গঠন প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুলিটির আসল আকার পুনর্নির্মাণ করেছেন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি প্রায় ৯ থেকে ১১ লাখ বছর পুরনো। তারা শতাধিক মানব ফসিলের সঙ্গে তুলনা করে দেখেছেন, এটি এমন এক বংশের প্রাচীনতম পরিচিত সদস্য, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল রহস্যময় ডেনিসোভানরা। যারা কিনা এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো এবং আধুনিক মানুষের সঙ্গে আন্তঃপ্রজনন করা এক প্রাচীন মানবগোষ্ঠী।
গবেষণা দলের প্রধান প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজিস্ট হিসেবে ছিলেন শিজুন নি। তিনি ফুদান বিশ্ববিদ্যালয় ও চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস-এর অধীনস্থ ইনস্টিটিউট অব ভার্টিব্রেট প্যালিওন্টোলজি অ্যান্ড প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজির সদস্য। শিজুন জানান, ‘ইউনশিয়ান ২’ নামে পরিচিত খুলিটি ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী এক পুরুষের।
প্রথমদিকে এই খুলিটিকে হোমো ইরেক্টাস প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়েছিল। হোমে ইরেক্টাসদের শরীরের গঠন বর্তমান মানুষের মতো হলেও মস্তিষ্ক ছোট এবং মুখমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য আলাদা ছিল। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এই খুলিতে হোমো ইরেক্টাস-এর মতো নয়, বরং ভিন্ন বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সহ-গবেষক ক্রিস স্ট্রিংগার বলেন, এর খুলি লম্বা ও নিচু, কপাল ঢালু এবং মোটা ভ্রূরেখা আছে। কিন্তু মস্তিষ্কের আয়তন এত পুরোনো কোনো হোমিনিনে আগে দেখা যায়নি। মুখ বড়, গাল চ্যাপ্টা ও সামনের দিকে, নাক বড় এবং বেরিয়ে আছে। তবে নিয়ান্ডারথালের মতো মধ্যমুখের অংশ উঁচু নয়।

দীর্ঘ সময় মাটির নিচে চাপ ও নড়াচড়ার কারণে খুলিটি আংশিকভাবে চূর্ণ ও বিকৃত হয়েছিল। তবে পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেখা যায়, এটি সম্ভবত হোমো লঙ্গি ও ডেনিসোভান-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি এশীয় মানবশাখার অন্তর্ভুক্ত।
২০১০ সালে সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহায় পাওয়া ফসিলের মাধ্যমে প্রথম ডেনিসোভানদের অস্তিত্ব জানা যায়। পরবর্তীতে এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে তাদের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। তারা হোমো স্যাপিয়েন্স এবং নিয়ান্ডারথাল উভয়ের সঙ্গেই প্রজননে যুক্ত হয়েছিল। সেই কারণে আজকের এশিয়ার অনেক মানুষের জিনোমে ডেনিসোভান ডিএনএ বহন করছে।
‘ইউনশিয়ান ২’ খুলির আবিষ্কার মানব বিবর্তনের পথচলার ধারা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। গবেষকদের মতে, প্রায় ১০ লাখ বছর আগে আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ায় অন্তত পাঁচটি বড় মস্তিষ্কবিশিষ্ট মানব শাখা আলাদা পথে বিকশিত হয়। এগুলো হলো— হোমো স্যাপিয়েন্স (আধুনিক মানুষ), হোমো লঙ্গি ও ডেনিসোভান, হোমো নিয়ান্ডারথালেনসিস (নিয়ান্ডারথাল), হোমো হাইডেলবার্গেনসিস ও হোমো ইরেক্টাস।
শিজুন নি বলেন, হোমো লঙ্গি শাখা এশিয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত সফল ছিল। তারা সম্ভবত ছোট ও বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীতে বসবাস করত এবং অন্যদের সঙ্গে কম যোগাযোগ রাখত, যার ফলে তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যে বৈচিত্র্য দেখা যায়। আমাদের নতুন আবিষ্কারের ভিত্তিতে আমরা মানব বিবর্তনের প্রচলিত সময়রেখাকে চ্যালেঞ্জ করছি।
প্রাচীনতম হোমো স্যাপিয়েন্স জীবাশ্ম প্রায় ৩ লাখ বছর পুরনো, কিন্তু গবেষকরা প্রস্তাব করছেন যে, আমাদের প্রজাতির বংশধারা অন্যান্য শাখা থেকে এরও কয়েক লাখ বছর আগে, সম্ভবত এক মিলিয়ন বছরের বেশি সময় আগে আলাদা হয়ে যায়।
স্ট্রিংগার বলেন, যদি ‘ইউনশিয়ান ২’ খুলিটি হোমো লঙ্গি/ডেনিসোভান ও হোমো স্যাপিয়েন্স উভয়ের উৎসের কাছাকাছি অবস্থান করে, তবে এটি মানবজাতির বিবর্তন প্রক্রিয়া বোঝার জন্য এখন পর্যন্ত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জানালা হয়ে উঠবে।
রয়টার্স অবলম্বনে










