কয়েক বছর আগে ইংল্যান্ডের সেন্ট অ্যালবানস শহরের স্কুল শিক্ষকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হাতে নিয়েছিলেন। তারা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেন তারা তাদের শিশুদের ১৪ বছর বয়সের আগে স্মার্টফোন না দেন। এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল স্মার্টফোনের আসক্তি থেকে শিশুদের মুক্তি দেয়া, কারণ শিক্ষকরা বিশ্বাস করেন যে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের মস্তিষ্কে স্থায়ী প্রভাব ফেলছে এবং তাদের শৈশবের ওপর নেতিবাচক প্রভাব রাখছে।
২০২৩ সালের শুরুর দিকে সেন্ট অ্যালবানসের কুনিংহাম হিল স্কুলের প্রধান শিক্ষক ম্যাথিউ ট্যাভেন্ডার এবং নির্বাহী প্রধান জাস্টিন এলবর্ন ক্লড, শহরের অন্যান্য স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে মিলে এই উদ্যোগটি হাতে নেন। একদিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্র স্কুলে স্মার্টফোন বের করলে সেখানকার প্রধান শিক্ষক তাকে সেটি রেখে দিতে বলেন। এরপরই শহরের অন্যান্য শিক্ষকরা একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন— তারা শিশুদের ওপর স্মার্টফোনের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবেন।
এই ঘটনার এক বছর পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে একটি জরিপে দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণীর ৬০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করছে, যা আগের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কম। সেন্ট অ্যালবানসের অন্যান্য স্কুলগুলোতেও এমন ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে একদিন সেন্ট অ্যালবানসে কোনো শিশুই স্মার্টফোন নিয়ে স্কুলে আসবে না।
জনাথন হেইটের ‘দ্য অ্যাংশাস জেনারেশন’ নামে একটি বইয়ে শিশুদের ওপর স্মার্টফোনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বইটি প্রকাশের পরই এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। লেখক বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে কিশোরীদের মধ্যে বিষণ্নতা এবং উদ্বেগের হার ৫০ শতাংশ বেড়েছে, এবং ১০-১৪ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ১৩১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। জনাথন হেইটের মতে, স্মার্টফোনের আগমন শিশুদের শৈশব ও মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
শিক্ষকরা বলেছেন, স্মার্টফোনে অতিরিক্ত সময় কাটানো শিক্ষার্থীদের মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অস্থিরতা এবং আবেগগত প্রতিক্রিয়া শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন আনছে, ফলে তারা অনেক দ্রুত মনোযোগ হারাচ্ছে এবং তাদের আগ্রহের বিষয়ও বদলে যাচ্ছে।
ট্যাভেন্ডার একদিন তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেছিলেন— একদিন আমরা তিনজন এক সঙ্গে ছয়টি ডিভাইস নিয়ে বসে ছিলাম। এর মধ্যে দুই ঘণ্টা কেটে গেলেও আমরা একে অপরের সঙ্গে কোনো কথা বলিনি। ওই দিনই আমি শিশুদের জন্য মুঠোফোন বিহীন একটি সুন্দর শৈশবের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলাম।
সেন্ট অ্যালবানসের স্মার্টফোন মুক্ত স্কুলের উদ্যোগ এখন শহরের অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। অভিভাবকরাও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ— যে তারা ১৪ বছর বয়সের আগে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন দেবেন না। এই উদ্যোগের ফলে সেন্ট অ্যালবানসের পাশাপাশি লন্ডনের দক্ষিণ অঞ্চলের স্কুলগুলোতেও স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।










