ইতালির সিসিলি দ্বীপের একটি শহর মেসিনা। চলতি মাসের শুরুর দিকে এখানে একটি শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে ব্যাপক লোকসমাগম হয়। যদিও তখন ইতালিজুড়ে চলছিল লকডাউন। এভাবে জাতীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করলেও স্থানীয় প্রশাসন টুঁশব্দটি করেনি। 

এর পেছনে একটি কারণ আছে। এটি কোনো সাধারণ শেষকৃত্য ছিল না। ডজনখানেক লোকের কাঁধে কফিনটিতে যে ৭০ বছর বয়সীর মৃতদেহ ছিল তিনি ইতালির কুখ্যাত এক মাফিয়া গ্রুপের সদস্য।

স্থানীয় মাফিয়া বিরোধী কমিটির প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া ফাভা এই ঘটনাকে ‘এটা কেলেঙ্কারি, যারা এই মহামারীতে প্রিয়জনকে হারিয়েছেন তাদের প্রতি অপমান’ এভাবে বর্ণনা করেন।

মার্চের শুরু থেকেই ইতালিতে শেষকৃত্যানুষ্ঠান সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণেই এই ব্যবস্থা। যেখনে করোনায় ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণহানি ঘটেছে ইতালিতে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে প্রকাশ্যে এভাবে আইন ভাঙা, দলবল নিয়ে শেষকৃত্য করার পেছনে ওই ক্ষমতার দম্ভ এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়মুক্তির সংস্কৃতিই সামনে এনেছে। ইতালির একটি অংশে মাফিয়াদের এমন দৌরাত্ম্য বহু বছর আগে থেকেই। 

এখানকার মাফিয়া বিরোধী কর্মকর্তা ও গবেষকরা বলছেন, বিশেষ করে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে মাফিয়ারা এরই মধ্যে মহামারীর সুযোগ নিতে শুরু করেছে। তারা গরীব মানুষকে দৈনিক খাবার ও অন্যান্য ত্রাণ দিচ্ছে, ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টাকা দিচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে যাদের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি প্রণোদনার টাকা বিতরণের আগেই তারা ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থ পৌঁছে দিচ্ছে।

ইতালির সবচেয়ে প্রতাপশালী মাফিয়া চক্র এনদ্রাংগেতা। কারাব্রিয়াভিত্তিক এ মাফিয়া সংগঠন ইউরোপে কোকেনের ৮০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বলে ধারণা করা হয়। এই মহামারীর সময় মাদক পাচার ও বিক্রয় যখন কঠিন হয়ে পড়ার কথা, তখনও তারা এই লকডাউনের সুবিধা নিচ্ছে।

স্থানীয় সাংবাদিক রবার্তো সাভিয়ানো নেপলসের মাফিয়া সংগঠন কামোরা নিয়ে একটি বই লিখেছেন- গোমোরাহ: ইতালি’স আদার মাফিয়া। তিনি বলছেন, লকডাউনের এই সময় মাদক চোরাকারবারিরা বিভিন্ন পয়েন্টে প্রশাসনের অনুপস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। এই সময় তো বিমান, জল ও স্থলবন্দরগুলোতে প্রশাসনের যথেষ্ট নজরদারি নেই। এই সুযোগটিই তারা নিচ্ছে।

তবে মাফিয়া গ্রুপের তৎপরতা কিন্তু মাদক ব্যবসার মধ্যে সীমিত নয়। অর্থনীতির অনেক গভীরে তাদের হাত থাকে। এমনকি সরকারের উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। সাধারণত মাফিয়াদের তৎপরতা চাঁদাবাজি, ছিনতাই এ ধরনের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই মহামারীর সময় এ ধরনের কাজ কিন্তু চলছে না। তবে মহামারীর তাদের অন্য সুযোগ করে দিয়েছে। 

ইতালির পুলিশ প্রধান ফ্রাঙ্কো গাব্রিয়েলি বলেন, মাফিয়া সংগঠনগুলো এরই মধ্যে অর্থনীতির অনেক গভীর পর্যন্ত তাদের হাত বিস্তৃত করেছে। কভিড-১৯- এর এই বিধিনিষেধে তাদের কিছুই হবে না। কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ থেকে শুরু করে সড়ক পরিবহন পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে।

সাংবাদিক সাভিয়ানো বলেন, এরা বিনিয়োগ করে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজক প্রতিষ্ঠানে, হাসপাতাল লন্ড্রি এবং ক্লিনিং কোম্পানিগুলোতে তাদের প্রচুর বিনিয়োগ আছে। এছাড়া পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ প্রতিষ্ঠান, গ্যাস স্টেশন এসব গত ১০ বছরে তাদের ব্যবসা প্রোফাইলে যোগ হয়েছে। 

এমন যাদের অর্থশক্তি তারা এই মহামারীর মধ্যে বিপদগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করবে এটাই স্বাভাবিক। এই পরিস্থিতিতে নগদ টাকার আর বিকল্প কোনো উৎস এসব ব্যবসায়ীদের নাগালে নেই। পুলিশ প্রধান গাব্রিয়েলি বলেন, এই জরুরি অবস্থার শেষ হওয়ার পর দেখা যাবে গোটা অর্থনীতিকে দূষিত করে ফেলেছে তারা। এমন কিছু কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানে তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলবে যেগুলোর ধারে কাছেও আগে কখনো ছিল না।

ইউনিভার্সিটি অব এসেক্সের অপরাধ বিজ্ঞানের প্রভাষক সের্গি বলেন, আগে এ ধরনের সঙ্কটের মধ্যে দেখা গেছে মাফিয়া গোষ্ঠীগুলো প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে অনেক দ্রুতগতিতে টাকা স্থানান্তর করতে পারে। তাছাড়া তাদের ঋণদান প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের মতো অতো শর্তও থাকে না। বিপদগ্রস্ত কোম্পানিকে টাকা দিয়ে উদ্ধার করার পর ধীরে ধীরে পুরো নিয়ন্ত্রণ হাতের মুঠোয় আনা মাফিয়াদের পুরনো কৌশল।

ইতালীয় কর্মকর্তারা বলছেন, রেস্টুরেন্ট ও হোটেলের মতো ব্যবসাগুলো সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ২০০৮ সালে মহামন্দার সঙ্গে তুলনা করলে এখন এই ব্যবসাগুলোই সবচেয়ে অরক্ষিত। 

এসওএস ইমপ্রেসার মতো মাফিয়া বিরোধী গ্রুপগুলো বলছে, সঙ্কট ইতালির মাফিয়াগুলোকে বৃহত্তম ব্যাংকে পরিণত করে। পালের্মো ভিত্তিক এই গ্রুপটি ২০১২ সালের এক হিসাবে দেখিয়েছে, এনদ্রাংগেতার তরল অর্থের পরিমান ৬ হাজার ৫০০ কোটি ইউরো। জাতীয় দুযোগের সময় এই অর্থ হয়ে উঠতে পারে নিয়ন্ত্রণ দখলমূলক ঋণদান কর্মসূচির তহবিল। যেখানে ইতালির অধিকাংশ ব্যাংকই এখন অস্তিত্বের লড়াইয়ে হাঁসফাঁস করছে। তারা ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

সাংবাদকি সাভিয়ানো মনে করেন, করোনাভাইরাস সঙ্কট পরবর্তী সময়ে তরল অর্থই হবে সর্বেসর্বা। তিনি বলেন, তখন এই মাফিয়া গ্রুপ বিপদগ্রস্ত কোনো কোম্পানির কাছে গিয়ে বলবে: আমরা তোমার সবকিছু কিনতে পারবো না। তবে ব্যবসার অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তোমাকে টাকা ধার দিতে পারি। এই কাজটা তারা সবার সঙ্গেই করবে। 

নিরাপত্তা দেয়ার নামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা- যুগ যুগ ধরে মাফিয়াদের প্রধান কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে গরীব, বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে সবার আগে তাদেরই দাঁড়াতে দেখা যায়। এ কারণেই এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বস্তিতে মাফিয়াদের এতো জনপ্রিয়তা। এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তারা বস্তিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

এদিকে ইতালি সরকার এখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এমনিতে ২০০৮ সালে মহামন্দা থেকেই দেশটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীলতার মধ্যে রয়েছে। এবার মহামারী শেষে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ৭৫ হাজার কোটি ইউরো জাতীয় অর্থনীতিতে ঢালার পরিকল্পনা করেছে সরকার।

এর একটি অংশ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে গ্যারান্টি লোন আকারে দেয়া হবে। চার ভাগের তিন ভাগ অর্থই যাবে এখাতে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বণ্টনে নজরদারি কতোটা সম্ভব হবে তা নিয়ে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাদের আশঙ্কা, এ ঋণের একটি অংশ চলে যেতে পারে মাফিয়া নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।

সিএনএন অবলম্বনে