করোনাভাইরাসের এ মহামারীতে অনেকেই নিজ বাড়িতে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বোধ করছেন। আবার অনেকে বেশি আক্রান্ত স্থান ছেড়ে দ্বিতীয় আবাসে থাকছেন। বুঝতেই পারছেন না যে তারা আসলে এক ‘মিথ্যা সুরক্ষায়’ বুঁদ হয়ে আছেন। কারণ নিউইয়র্কের শহরতলী এবং লং আইল্যান্ডের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে এরই মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বাদ যায়নি সাফোক কাউন্টিও। নিউইয়র্ক শহরের অতিধনী বাসিন্দাদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কেন্দ্র হ্যাম্পটনস ঠিক এখানেই অবস্থিত।
যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের উপকেন্দ্র নিউইয়র্ক ছেড়ে একজন বিলিয়নেয়ার টেক্সাসে তার বাগানবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, আরেকজন পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ম্যাসাচুয়েটসের মার্থাস ভিনিয়ার্ডে, এক দম্পতি বাহামাসের হারবার দ্বীপের একটি বাগানবাড়িতে এবং একজন লং আইল্যান্ডে একটি ইয়োট ভাড়া নিয়েছেন... ইত্যাদি ইত্যাদি।
যদিও সবাই এমন না। যেমন বিলিয়নেয়ার বিল গেটস করোনাভাইরাসের গবেষণায় বড় ধরনের তহবিল অনুদান দিয়েছেন।
এটা বলা অনুচিত যে, তারা নির্ভয়ে জীবনযাপন করছেন। কারণ এখন পর্যন্ত কভিড-১৯ এর ধনী-গরীব বৈষম্যমূলক আচরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হাই প্রোফাইল কয়েকজনের করোনা আক্রান্তের খবর তাদের জানা উচিৎ। বাস্কেটবল দল নিকের মালিক জেমস ডোলান, অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস ও প্রিন্স চার্লসের মতো ব্যক্তিরা প্রাণঘাতি এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
এ বিষয়ে তিনটি দেশে বাড়ি থাকা একজন মাল্টি মিলিয়নেয়ার বলেন, ‘আমরা কেবল নিজের ও পরিবারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে চাইছি। এর জন্য আপনি আমাদের দোষ দিতে পারেন না।’ নাম প্রকাশ না করতে অনিচ্ছুক এমন কয়েকজন ধনী জানিয়েছেন, তারা অনুধাবন করেছেন যে নিউইয়র্ক সিটির মতো জনবহুল স্থানে পড়ে না থেকে একটু ফাঁকা স্থানে থাকাটা নিরাপদ হবে।
ধনী ব্যক্তিদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি না হলেও তাদের সম্পদ কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশনে বা আলাদা থাকা সহজ করে তুলেছে। কিন্তু জরুরি কাজে নিয়োজিত কর্মী, গৃহকর্মী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষজন, যাদের প্রতিদিন বা সাপ্তাহিক বেতন ছাড়া সংসার চলে না, তাদের জন্য করোনাভাইরাস দুর্ভিক্ষের মতো দেখা দিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১ শতাংশ উপার্জনকারী অন্যদের তুলনায় নিজেদের জন্য ভালো ব্যবস্থা তৈরি করছে। হ্যাম্পটনের কিছু মানুষ এই অবসর সময়টি উপভোগ করছেন। কেউ গলফ খেলছেন, কেউ বাগান করছেন, আবার একজনের কথা জানা গেছে যিনি তার পরিবারের জন্য প্রতিদিন নিউইয়র্কের বাইরে থেকে খাবার আনাচ্ছেন।
নিম্নআয়ের মানুষদের সঙ্গে এটা বড় ধরনের অভিজ্ঞতার পার্থক্য। কারণ এ সঙ্কটকালে তারা এমন কিছু করার চিন্তাও করতে পারেন না। নিজের দোকান খুলতে বা গুরুতর অসুস্থ হয়ে গেলে তাদের গণপরিবহনে চড়তে হচ্ছে। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে ধনীদের আরো বেশি মাথাব্যথা হলো সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়। কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সঙ্কট পরবর্তীতে কর মওকুফ, প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধা পাবেন- এই ভেবে তারা নিজেদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একজন বলেছেন, করোনাভাইরাসের এ সঙ্কট তাদের আরো ধনী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষিত মহামারী বিশেষজ্ঞ ডা. অশ্বিন ভাসান জানান, তিনি ধনী ব্যক্তিদের নিজস্ব ভেন্টিলেটর সংগ্রহের কথা শুনেছেন। অথচ হাসপাতালগুলোতে এ ভেন্টিলেটরের তীব্র সঙ্কট চলছে। তার ওপর অনেক ধনী ব্যক্তি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলা ওষুধগুলোও সংগ্রহ শুরু করেছেন।
শহর ছাড়ার বিষয়ে হার্ভার্ডের সাবেক অধ্যাপক ও জীববিজ্ঞানী ডা. উইলিয়াম হ্যাসেলটাইন বলেন, অভিজাতদের শহর ছাড়ার মতো পদক্ষেপ ভয়াবহ হতে পারে। শহরে থাকাদের তুলনায় তারা বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। কারণ এখানে থাকলে তারা সাবধানে থাকতেন, বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখতেন, স্বাস্থ্যবিধি চর্চা করতেন এবং সেরা হাসপাতালের কাছে ছিলেন। নিউইয়র্ক সিটির মতো লং আইল্যান্ডে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এতো বিস্তৃত না...। এটা আমাদের কাছে খুবই উদ্বেগের বিষয়।
তিনি বলেন, আপনি একটি বিস্তৃত খোলা জায়গাকে নিরাপদ মনে করছেন। এটা ‘একটা বুনিয়াদি ভুল’। আপনি মনে করছেন, এখানে অনেক জায়গা, বেশি মানুষজন নেই, আমিই বিশেষ ব্যক্তি। এটা পুরোটাই মনস্তাত্ত্বিক।
সিএনএন- এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ভিকি ওয়ার্ডের মন্তব্য প্রতিবেদন










