এক ছিল বিড়াল। নাম তার টম। বিড়াল যে ইঁদুরের জম তা সবার জানা। কিন্তু ইঁদুরও যে বিড়ালকে নাজেহাল করতে পারে তা হয়ত জানা যেত না জেরির আবির্ভাব না হলে। আজ থেকে প্রায় আশি বছর আগে শুরু হয়েছিল এই টম আর জেরির লড়াই, এখনো চলছে।
যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে জেরিকে বাড়ি থেকে তাড়াতে নানা ফন্দিফিকির করে টম। কিন্তু সব চেষ্টা মাটি করে দেয় এই নেংটি ইঁদুর। সারাক্ষণ একজন আরেকজনের পেছনে লেগে থাকে, আবার বেশিক্ষণ আলাদাও থাকতে পারে না! এমনি এক মধুর সম্পর্ক এই দুই প্রাণীর। এই খুনসুটি কখনো কখনো সহিংসতার পর্যায়ে চলে যায়। তবে কার্টুনের জগতে কেউ মরে না। হাতুরির আঘাতে চিড়ে চ্যাপটা হয়ে যাওয়া টম দিব্যি বেঁচে উঠে আবার জেরিকে তাড়া করে। এখানে মৃত্যুও হয়ে ওঠে হাসির খোরাক!
কার্টুন জগতের অনন্য এই দুই চরিত্র নিয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ সালে যাত্রা শুরু করে ‘টম অ্যান্ড জেরি’। পরিচালক ছিলেন উইলিয়াম হ্যানা, জোসেফ বারবারা ও রুডলফআইসিং। সংগীত পরিচালক ছিলেন স্কট ব্র্যাডলি। টমের মানুষের মতো চিৎকারে হ্যানা নিজেই কণ্ঠ দিতেন। পর্কি পিগ , মিকি মাউসের মতো চরিত্রেরও জন্ম দিয়েছেন অ্যানিমেটার উইলিয়াম হ্যানা ও জোসেফ বারবারা। হলিউডের মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ার (এমজিএম) স্টুডিওর নির্মাণ ও বর্তমানে হ্যানা বারবারা স্টুডিওতে নির্মিত জনপ্রিয় কার্টুন টম অ্যান্ড জেরি। এতে টম একটি বিড়াল এবং জেরি একটি ছোট নেংটি ইঁদুর, যাদের নানা দুষ্টুমি এই কার্টুনের প্রতিপাদ্য।
একঘেঁয়েমি কাটাতে ৩০ বছরেরও কম বয়সী এই দুই অ্যানিমেটর নিজেদের মতো করে ভাবতে শুরু করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত বারবারা ইঁদুর আর বিড়াল নিয়ে কার্টুনের একটি অতি সাধারণ ও খুবই প্রচলিত ধারণা বেছে নিয়েছিলেন। এ দুই চরিত্র নিয়ে অন্য গল্পগুলোর মতোই এখানেও থাকবে সংঘাত ও খুনসুটি।
তাদের কার্টুনটির প্রথম পর্বের কাজ শেষ হয় ১৯৩৯ সালে। আর এটি থিয়েটার হলে প্রথম প্রদর্শিত হয় পরের বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি। এটির নাম ছিল ‘পুটস গেটস দ্য বুট’। ৯ মিনিট ৮ সেকেন্ডের এই কার্টুন শ্রেষ্ঠ অ্যানিমেটেড শর্ট হিসেবে অস্কার জিতে নেয়। যদিও অসাধারণ কাজ সত্ত্বেও, অস্কারে স্বীকৃতি পাননি হ্যানা ও বারবারা। প্রথম কার্টুনটিতে বিড়ালের নাম ছিল জ্যাস্পার আর ইঁদুরের নাম ছিল জিনক্স।
তাদের দ্বিতীয় পরিবেশনা ছিল ‘ওয়ান্ডারফুল ক্যাট অ্যান্ড মাউস কার্টুন’। এর পরই অ্যানিমেটর জন কারের প্রস্তাবে তারা ‘টম অ্যান্ড জেরি’ নামে কার্টুন জগতে রাজত্ব শুরু করেন। তবে অ্যানিমেশনটি কেন নির্বাক সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কখনো কিছু বলেননি বারবারা। যদিও তিনি বলেছেন, নির্বাক যুগের বিখ্যাত কমেডিয়ান চার্লি চ্যাপলিন ছিলেন অনুপ্রেরণা। সংলাপ ছাড়াও যে কোনো চরিত্র আনন্দদায়ক হতে পারে তার অনন্য উদাহরণ তিনি। টম আর জেরি আরেকবার প্রমাণ করেছে সংলাপই মুখ্য নয়।
টম অ্যান্ড জেরির দুই স্রষ্টা উইলিয়াম হ্যানা ও জোসেফ বারবারা
এ যাবত টমের চেহারাতেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ১৯৪০ এর শুরুর দিকে তার চেহারা ছিল অনেকটি এরকম— রোমশ পশম, মুখে অসংখ্য ভাঁজ, দুই ভ্রুর মাঝখানে গভীর ভাঁজ। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সবগুলোই পরবর্তীতে আরো মসৃণ করা হয়েছে। জেরি অবশ্য প্রায় অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। ১৯৪০ এর মাঝামাঝি থেকে, সিরিজটি আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছেন ১৯৪২ সালে এমজিএম-এ যোগ দেয়া টেক্স এভারি।
প্রথম দুই দশকে হ্যানা ও বারবারা শতাধিক পর্ব নির্মাণ করেছিলেন। যার এক একটি নির্মাণে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেত। আর প্রতি পর্বে খরচ হতো ৫০ হাজার ডলার। এত পরিশ্রম, এত খরচ করেও আর্থিক দিক দিয়ে তারা খুব বেশি লাভবান হতেন না। তবে তাদের স্বার্থকতা হলো বিশ্বে ‘টম অ্যান্ড জেরি’ শ্রেষ্ঠ। যা আরো ছয়বার এনে দেয় অস্কার। আজও এর আবেদন বিন্দুমাত্র কমেনি। বাচ্চা থেকে বুড়ো প্রায় সবারই প্রথম পছন্দ এই কার্টুন। কার্টুনটি অবশ্য এমজিএমের আরেকটি কার্টুনের কাছে হেরে যায়। কার্টুনটি ছিল রুডলফ আইসিংয়ের ‘দ্য মিল্কি ওয়ে’।
কার্টুনের ইতিহাসবিদ জেরি বেক বলেন, আমি বাজি ধরে বলতে পারি এখনো এই কার্টুন দেখতে বসলে যে কেউ তার ছেলেবেলায় ফিরে যাবে। এই অ্যানিমেশন চিরদিনঅম্লান থাকবে। চীনে ‘টম অ্যান্ড জেরি’ মোবাইল গেমস খেলে প্রায় ১০ কোটি শিশু। যুক্তরাজ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও বেশ জনপ্রিয় এই সিরিজ।
হ্যানা মারা যান ২০০১ সালে আর বারবারা ২০০৬ সালে। বর্তমানে এই কার্টুনের স্বত্বাধিকারী ওয়ার্নার ব্রাদারস। এই বছরের ক্রিসমাসের আগেই আবার পর্দায় আসছে ‘টম অ্যান্ড জেরি’।
বিবিসি, উইকিপিডিয়া অবলম্বনে উম্মে সালমা










