প্রায় ৫০ কোটি বছর আগের এক অদ্ভুত সামুদ্রিক শিকারির জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। এটি আমাদের গ্রহের প্রাচীন জীবনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। মোসুরা ফেন্টোনি নামের এই ক্ষুদ্র অথচ ভয়ংকর প্রাণীটি লম্বায় ছিল মাত্র ছয় সেন্টিমিটার। কিন্তু এর মাথায় ছিল তিনটি তীক্ষ্ণ চোখ—দুই পাশে দুটি ও একটি ঠিক মাঝখানে। যেন কোনো রহস্যময় অতীত থেকে উঠে আসা ত্রিলোচনের দানব, যা গভীর সমুদ্রের বুকে শিকার খুঁজে বেড়াত।

সম্প্রতি কানাডার বার্গেস শেল অঞ্চলে পাওয়া ৬১টি জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে এই নতুন প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এর মুখের গঠনও ছিল বিস্ময়কর। মাত্র ছয় সেন্টিমিটার লম্বা হলেও প্রাণীটির শরীরজুড়ে ছিল শিকারের নিখুঁত প্রস্তুতি—তিনটি চোখ, ধারালো দাঁতযুক্ত গোলাকার মুখ ও কাঁটাযুক্ত পাখনা। এছাড়া এদের চোখের গঠন এমন ছিল, যেন আধুনিক ড্রাগনফ্লাই। শিকার দেখেই ধেয়ে যেত মোসুরা।

মোসুরা ফেন্টোনি আসলে বিলুপ্ত আর্থ্রোপড গোষ্ঠী রেডিওডন্টের সদস্য। এদের শরীর ছিল ২৬ খণ্ডের, যার মধ্যে ১৬টি খণ্ডে ছিল শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য গিলস। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের এই জটিল গঠন কাঁকড়া বা কিছু জলজ পোকামাকড়ের মতোই।

গবেষকরা দুটি ভিন্ন আলোতে এই জীবাশ্মের ছবি তুলেছেন। বাম পাশের ছবিটি দেহের আকৃতি তুলে ধরে আর ডান পাশের ছবিটিস অন্ত্র, সংবহনতন্ত্র, চোখ ও স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিফলিত চিহ্নগুলি প্রদর্শন করে

গবেষকরা দুটি ভিন্ন আলোতে এই জীবাশ্মের ছবি তুলেছেন। বাম পাশের ছবিটি দেহের আকৃতি তুলে ধরে আর ডান পাশের ছবিটিস অন্ত্র, সংবহনতন্ত্র, চোখ ও স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিফলিত চিহ্নগুলো প্রদর্শন করে। ছবি: সিএনএন

প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন, এই জীবাশ্মগুলোর মধ্যে কিছু এতটাই ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল যে, বিজ্ঞানীরা এর স্নায়ুতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, এমনকি রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার চিহ্নও খুঁজে পেয়েছেন। মোসুরার একটি হৃৎপিণ্ডও ছিল। এটি রক্তকে তার দেহের অভ্যন্তরীণ গহ্বরে পাম্প করত।

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মোসুরা ফেন্টোনি সম্ভবত সাগরের বুকে অনেকটা রশির মতো এঁকেবেঁকে সাঁতার কাটত। এরা অপেক্ষাকৃত ছোট প্রাণীদের শিকার করত। এদের চোখের বিশেষ গঠন আধুনিক ড্রাগনফ্লাইয়ের চোখের মতো, যা দ্রুত নড়াচড়া করা শিকারকে নির্ভুলভাবে ধরতে সাহায্য করত।

প্রথম মোসুরা ফেন্টোনির জীবাশ্ম ১৯০৯ সালে জীবাশ্মবিদ চার্লস ওয়ালকট আবিষ্কার করলেও, তখন এর গুরুত্ব সঠিকভাবে বোঝা যায়নি। ১৯৯০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে রয়্যাল অন্টারিও মিউজিয়াম ও ম্যানিটোবা মিউজিয়ামের গবেষকরা আরো ৬০টি জীবাশ্ম সংগ্রহ করেন। গবেষণা শেষে এই বছরের শুরুতে রয়্যাল সোসাইটি ওপেন সায়েন্স জার্নালে প্রাণীটির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ পায়।

মজার বিষয়, এই প্রাণীর নাম এসেছে জাপানি কাল্পনিক দানব ‘মোথরা’ থেকে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গঠনে এই পুরাতন জীবের সঙ্গে মোথরার রয়েছে বিস্ময়কর মিল।

মোসুরা ফেন্টোনি এখন প্রদর্শিত হচ্ছে টরন্টোর রয়্যাল অন্টারিও মিউজিয়ামের ‘ডন অফ লাইফ’ গ্যালারিতে। শিগগিরই এটি ম্যানিটোবা মিউজিয়ামেও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হবে।

মহাসময়ের অতল থেকে উঠে আসা এই প্রাণী যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর অতীত কতটা বিস্ময় ও রহস্যে ভরা।

—সিএনএন