আমরা সৌন্দর্যবোধে পেশির উপস্থিতিকে যেভাবে মূল্যায়ন করি, তার পেছনে আছে বহুস্তরীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব—যার মধ্যে অন্যতম লিঙ্গ। বিষয়টি কেবল সৌন্দর্যের আলোচনায়ই সীমাবদ্ধ নয় বরং ‘অতিরিক্ত পেশিবহুল’ শব্দবন্ধ নারীত্বের মৌলিক পরিচয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারে—যদি একজন নারীর পেশি তথাকথিত সামাজিক মানদণ্ড ছাড়িয়ে যায়, তবে কি তিনি আদৌ ‘নারী’ হিসেবে গণ্য হবেন?
২০১৭ সালে হার্ভার্ডে এক আলোচনা সভায় ব্যালে তারকা মিস্টি কোপল্যান্ড বলেছিলেন, ‘আমার শরীরকে কেন বলা হচ্ছে খুব বেশি পেশিবহুল? এটা আসলে একটি সাংকেতিক ভাষা—যার অর্থ—তোমার গায়ের রং ঠিক নয়।’ ২০১৬ সালে দ্য গার্ডিয়ানে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে টেনিস কিংবদন্তি সেরেনা উইলিয়ামস বলেন, তাকে একদিকে বলা হয়েছে ‘খুব পেশিবহুল ও পুরুষালি’, আবার কিছুদিন পরই বলা হয়েছে ‘অতিরিক্ত খোলামেলা আবেদনময়ী’।
ব্যালে বা টেনিসের মতো শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যযুক্ত অঙ্গনে ‘অতিরিক্ত পেশিবহুল’ কথাটি প্রায়শই ‘অতিরিক্ত কৃষ্ণাঙ্গ’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়—এমন দেহ, যেগুলো যেন ওই পরিসরে ‘নিয়মিত’ নয়। এইসব মূল্যায়নে জটিলভাবে জড়িয়ে যায় নারীত্ব, বর্ণ ও ক্ষমতার রাজনীতি।
‘অতিরিক্ত পেশিবহুল’ বলে ট্রান্সজেন্ডার নারী অ্যাথলেটদেরও আক্রমণ করা হয়ে থাকে—বিশেষ করে যাদের টেস্টোস্টেরন প্রাকৃতিকভাবেই বেশি। ক্রীড়াক্ষেত্রে ট্রান্সজেন্ডার নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে চলমান বিতর্ক মূলত গড়ে উঠেছে পেশির আধিক্য এবং কিশোর বয়সে শরীরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের ভিত্তিতে।
এই বিতর্ক আমাদের দীর্ঘকালীন লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনকে চ্যালেঞ্জ করে। বোস্টন ও নিউইয়র্ক ম্যারাথনের মতো বড় ইভেন্টগুলোতে সম্প্রতি ‘নন-বাইনারি’ বিভাগের সংযোজন সেই চ্যালেঞ্জেরই আংশিক উত্তর।
আমাদের সমাজে নারীদের শরীর ও জীববিজ্ঞান নিয়ে গড়ে ওঠা বহু কল্পকাহিনি এখনো টিকে আছে—এবং এগুলো নারীর সামাজিক ক্ষমতার ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাম্বার ফিটসিমন্স বলেন, ‘অতিরিক্ত পেশিবহুল’ মানে ‘পুরুষালি’। নারীরা এখনো পুরুষের মতো দেখতে হওয়ার ভয়ে কাঁপে, এবং এই ভয় আজও নারীদের ব্যায়াম বা শরীরচর্চার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা পুরুষদের ক্ষেত্রে পেশিবহুল সৌন্দর্যের বহু রূপ স্বীকার করি—দীর্ঘদেহী ম্যারাথন দৌড়বিদ থেকে শুরু করে বিশালদেহী কুস্তিগির পর্যন্ত। অথচ নারীদের ক্ষেত্রে এই পরিসীমা অত্যন্ত সংকীর্ণ।’
নারী অ্যাথলেটদের মধ্যেও একধরনের দ্বিচারিতা থাকে—একদিকে পারফরম্যান্সের জন্য প্রয়োজনীয় দেহ, অন্যদিকে সমাজে ‘সুন্দর’ দেহের মাপকাঠি। অনেক নারী অ্যাথলেট খেলাধুলার ময়দানে তাদের পেশির কার্যকারিতা নিয়ে গর্ববোধ করলেও, সামাজিক পরিবেশে সেই পেশিই তাদের অস্বস্তিতে ফেলে—যেন ড্রেস বা জিনস পরলে তারা অস্বাভাবিক দেখাবে। ফলে অনেকেই ব্যায়ামে সংযমী থাকেন, ‘অতিরিক্ত পেশিবহুল’ হয়ে যাওয়ার ভয়ে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে তারা সাজসজ্জার মাধ্যমে নারীত্বকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেন।
সুপারহিরোদের শরীর ঘিরেও এই দ্বৈততা বিদ্যমান। নারী সুপারহিরোদের শক্তিশালী দেখানো হলেও তাদের শরীরকে অবশ্যই ‘আকর্ষণীয়’ হতে হয়—ছোট কাঁধ, সমতল পেট, কিন্তু বক্ষ ও নিতম্ব সুগঠিত, যেন এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত বালিঘড়ি’র আকৃতি। অন্যদিকে, পুরুষ সুপারহিরোদের দেহগঠন—বিশাল বাইসেপস, প্রশস্ত কাঁধ, সংকীর্ণ কোমর—হলিউড ও মার্কিন সমাজে ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। অথচ বাস্তব জীবনে এসব পেশি সব সময় কার্যকর নয়। যেমন, জিমন্যাস্টদের পেশি অনেক সময় কম আড়ম্বরপূর্ণ হলেও অত্যন্ত কার্যকর।
এইসব ধারণা শুধু হলিউড বা কমিকস নয়, আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়েও প্রতিফলিত হয়। ফলে পেশির সৌন্দর্য—আইকনোগ্রাফি এক অর্থে পুরুষদেরও ক্ষতি করছে।
সমাজবিজ্ঞানী জ্যাকলিন সিগেল দেখিয়েছেন, কীভাবে পুরুষদের ওপর চাপিয়ে দেয়া ‘আদর্শ পুরুষদেহ’ খাওয়া-দাওয়া সংক্রান্ত মানসিক সমস্যা ও অতিরিক্ত ব্যায়ামের মতো অভ্যাসকে উসকে দেয়।
তবে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক পরিসরে দেহের সৌন্দর্যের মানদণ্ড আলাদা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন বিভিন্ন ধরনের দেহ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নারী অ্যাথলেটরা দেহ এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলছেন। এবং সব বয়সের নারী আজকাল জিমে ভার উত্তোলন করছেন—কারণ চিকিৎসকরাও এখন ‘আয়রন থেরাপি’ প্রেসক্রাইব করছেন।
মার্লিন ফ্লাওয়ার্স, যিনি ‘গ্র্যানি গানস’ নামে পরিচিত, ৬৮ বছর বয়সে ইন্টারনেটে জনপ্রিয় হয়েছেন ভার উত্তোলন শুরু করে। তার ব্যঙ্গাত্মক, হাস্যরসপূর্ণ ভিডিওগুলো সমাজে প্রবাহিত শক্তিধারণা ও বার্ধক্যঘেরা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।










