নতুন ভাষা শেখার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। কেউ শেখে পেশাগত প্রয়োজন থেকে, কেউ ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগের জন্য, আবার কেউ শেখেন কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি আগ্রহ থেকে। গবেষণা বলছে, ভাষা শেখা শুধু প্রয়োজন নয়, এটি মস্তিষ্কের জন্যও উপকারী। খবর ডয়চে ভেলে।

২০২৪ সালে জার্মানির সিরিয়ান শরণার্থীদের ওপর এ গবেষণা চালানো হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল, জার্মান ভাষা শেখার সময় তাদের মস্তিষ্কে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে সেটা দেখা। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ভাষা শেখার আগে, শেখার সময় এবং শেখার পরে পরিমাপ করা হয়।

সেখানে দেখা যায়, ভাষা শেখার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিউরাল স্ট্রাকচার বা মস্তিষ্কের গঠনগত কাঠামো পরিবর্তিত হয়। কিন্তু আসলে নতুন ভাষা শেখার সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে? আর এটা কি সত্যিই মানুষকে আরও বুদ্ধিমান করে তোলে?

ভাষা প্রক্রিয়াকরণের জন্য দুটি প্রধান সার্কিট কাজ করে। একটি শব্দ শোনা ও উচ্চারণ করার জন্য, যা ভাষার ভিত্তি তৈরি করে। আরেকটির কাজ হল, কোন ভাষার শব্দ ব্যবহার করা হবে সেটা ঠিক করা। বহুভাষীদের ক্ষেত্রে এ দুটি সার্কিট আরো সক্রিয়ভাবে কাজ করে, যা তাদের মানসিক সক্ষমতা বাড়ায়—এমনটিই জানান ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, নিউরোসায়েন্টিস্ট আর্তুরো হার্নান্দেজ।

ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান, আমরা যখন নতুন ভাষা শিখি বা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় যাই, তখন এ সার্কিটগুলো নতুনভাবে গঠিত হয়। এটি এভাবে মূলত শব্দের মানচিত্র তৈরি করে এবং ঠিক করে, আমরা কোন ভাষা ব্যবহার করব।

গবেষণার ফল অনুযায়ী, ভাষা শেখার ফলে মস্তিষ্কের গঠন পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে গ্রে-ম্যাটার বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি এটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ায়। ফলে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা উন্নত হয়। সুতরাং এটি ভাষা প্রক্রিয়াকরণ ও নির্বাহী কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ তথ্য দিয়েছেন পেনসিলভানিয়া এলিজাবেট টাউন কলেজের কগনিটিভ নিউরোসায়েন্টিস্ট জেনিফার উইটমেয়ার।

ছোট বয়সে ভাষা শেখা সহজ হয়, কারণ তখন মস্তিষ্ক খুব দ্রুত নতুন তথ্য গ্রহণ করতে পারে। শিশুদের জন্য ভাষা শেখা সহজ হলেও, প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্কেও ভাষা শেখার সময় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। এটি এক ধরনের মানসিক ব্যায়াম, যা স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ায়। তাই বলা যায়, ভাষা শেখা মানুষকে আরো স্মার্ট করে তোলে।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, একাধিক ভাষা জানা ব্যক্তিরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মনোযোগ ধরে রাখা এবং মাল্টিটাস্কিংয়ে একভাষীদের তুলনায় বেশি দক্ষ। ২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, বহুভাষী শিশুদের একাগ্রতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপের প্রায় ৫৪ শতাংশ মানুষ অন্তত দুটি ভাষায় কথা বলতে পারেন। এশিয়ায় এ হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও, ভাষা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাষা শেখা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়, বরং পেশাগত ও সামাজিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।