করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তার ঠেকাতে বেশিরভাগ দেশে চলছে লকডাউন। অফিস, আদালতের মতো বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। ঘরের মধ্যে আটকে আছে বিদ্যালয়গামী শিশু-কিশোররা। ঘরে থাকার এ সময়ে শিশুর পড়াশোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। এই ঘরবন্দি সময়ের জন্য অনেক স্কুল থেকে শিক্ষকরা হোমওয়ার্কেও দীর্ঘ তালিকা করে দিয়েছেন এমনটি জানা যাচ্ছে। আবার উদ্বিগ্ন বাবা-মায়েরাও বাচ্চাদের পড়ার টেবিলে বসার জন্য দৈনিক তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছেন। আবার অনেক দেশেই চলছে ভার্চুয়াল ক্লাসরুম। বাংলাদেশেও সীমিত পরিসরে হলেও এটি শুরু হয়েছে। অর্থাৎ ভাইরাস কারণে ঘরে বন্দি থাকতে হলেও পড়াশোনায় মাফ নেই! 

কিন্তু ব্রিটেনের প্রথম ক্রীড়াবিষয়ক অধ্যাপক পল রামচন্দানি বলছেন, এতে শিশুদের উপকার হচ্ছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। তার পরামর্শ বরং এই সময়টা বাচ্চাদের হাতে ছেড়ে দিন। তাদের নিজের মতো করে খেলতে দিন। বাবা-মায়ের কাজ হলো, তাদের কাজকর্ম গভীরভাবে পযবেক্ষণ করা এবং তাদের অনুসরণ করা, তাদের সঙ্গে খেলায় যোগ দেয়া। সর্বোপরি শিশুর মানসিক বিকাশের দিকেই বেশি নজর দেয়া দরকার।

রামচন্দানি বলছেন, বাড়িকে স্কুল বানিয়ে ফেলবেন না। বরং শিশুকে খেলতে দিন এবং খেলায় আপনিও যোগ দিন। 

যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ‘লেগো প্রফেসর অব প্লে’ পল রামচন্দানি বলছেন, ঘরে বসে বিদ্যালয়ের মতো পড়াশোনা হবে না এবং সম্ভবত হওয়া উচিতও নয়। করোনাভাইরাসে শিশুদের বাসার মধ্যে আটকে থাকাটা পারিবারিক শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, বাচ্চাদের কাজকর্মের প্রতি খেয়াল করতে পারা, সেটি থেকে অর্থ উদ্ধার এবং সে মতো সাড়া দেয়া ও প্রতিক্রিয়া জানাতে পারার সক্ষমতা তাদের মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে শিশুর বাবারা কিন্তু অনন্য ভূমিকা রাখতে পারেন। আমরা কয়েকটি গবেষণা থেকে জানি, যেসব শিশুর সঙ্গে তাদের বাবার সম্পর্ক গভীর এবং সেই সম্পর্কটি যদি হয় মজার সেই শিশুদের আচরণগত উন্নয়ন ও অন্যান্য বিকাশ তুলনামূলক বেশি হয়।

কোন ধরনের খেলাধুলা শিশুদের জন্য ভালো? সে ব্যাপারে রামচন্দানির পরামর্শ হলো, অগোছাল, লাফালাফি, দৌড়ঝাঁপ এবং অন্যান্য শারীরিক ক্রীড়া শিশুদের নানা দক্ষতা আয়ত্ত করতে সহায়তা করে। পাশিপাশি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে সমন্বয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো দক্ষতা অর্জন করে। 

ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে বাবারা মজাদার খেলা এবং গলা মিলিয়ে গান গাওয়াসহ বিভিন্ন ক্রীড়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। 

বাচ্চাদের অগোছাল ও খেয়ালিপনা নিয়ে বাবা-মায়ের নেতিবাচক চিন্তা করা উচিত নয়। শিশুরা বিভিন্ন ধরনের খেলার মাধ্যমে নানা বিষয়ে শিখতে ও উপভোগ করতে পারে। এই লকডাউনের মধ্যে বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধূলা করা ও সময় কাটানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো খেলার অধিনায়কত্বটা তাকেই দিতে হবে।

আপনার শিশু কী করছে তা খেয়াল করুন এবং অনুসরণ করে তাদের আগ্রহের বিষয়টি খুঁজে বের করুন। বাচ্চাদের এগুলো দেখা এবং সে অনুযায়ী বাবা-মায়েদের সাড়া দেয়ার চর্চা ছোট শিশুদের শিখনে সহায়তা এবং সামাজিক ও মানসিক বিকাশের চাবিকাঠি। শিশুদের শেখানোর ক্ষেত্রে কখনো তাড়াহুড়া করা যাবে না। যতো সময়ই লাগুক তাকে তার কাজটি নিজে শেষ করতে দিন। মনে রাখবেন শিশুরা এভাবেই শেখে।

শিশুর সঙ্গে বাবা-মায়ের মজার সম্পর্ক ও খেলাধুলায় অংশ নেয়া শিশুর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তবে পল রামচন্দানি একটা বিষয় জোর দিয়ে বলছেন, শিশুর সঙ্গে বাবা-মার ক্রীড়ামূলক সম্পর্ক কতোটা প্রভাব ফেলে তার বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা এই মুহূর্তে দেয়া যাচ্ছে না। তবে আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, বাচ্চাদের খেলতে পারার স্বাধীনতার সঙ্গে সুস্বাস্থ্য এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে।

তিনি বলেন, এরকম একটি কঠিন ও বিষণ্ন সময়ে শিশুদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাবা-মায়ের কাছ থেকে স্নেহ ভালোবাসা ও যত্ন পাওয়ার নিশ্চিয়তা। এই সময় খেলাধুলা অনেকখানি সহায়তা করতে পারে।

পল রামচন্দানি (৫১) একজন নাপিতের ছেলে। ব্রিটেনের কেন্ট কাউন্টির মেইডস্টোনে তার জন্ম। সেখানে তিনি সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তীতে তার সপরিবার ব্রিস্টলে চলে যায় এবং রামচন্দানি সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে  মেডিসিনে পড়াশোনা করেন। 

স্নাতক শেষ করার পরে তিনি ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস) বিভাগে ১০ বছর কাজ করেন এবং শিশু মনোচিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বীজ মূলত শৈশবেই প্রোথিত হয়- এই উপলব্ধির পর তিনি শিশুর মন নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি এর আগে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনে শিশু-কিশোর মনোবিজ্ঞান বিষয়ে পড়িয়েছেন। এখন তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লেগো প্রফেসর অব প্লে। ব্রিটেনের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এটিই প্রথম এবং একমাত্র পদ।

রামচন্দানি যুক্তরাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার দিকে বেশি জোর দেয়ার নীতির একজন সমালোচক। তিনি বলেন, আমরা যে বয়সে শিশুদের ক্লাসে বসার প্রত্যাশা করি, সেক্ষেত্রে এই দেশে শেখার যে পদ্ধতিটি তৈরি করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে আমি লড়াই করছি। অনেক কম বয়সী শিশুদের জন্য এখন ‘শিক্ষার লক্ষ্য’ নির্ধারণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার সময় আমি অনেক শিশুকে দেখেছি। বিশেষ করে দেখেছি তারা কিন্তু ক্লাসে বসে থাকতে এবং পড়াশোনায় অংশগ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। 

খেলা বাচ্চাদের বিশ্বকে অন্বেষণ করার উপায়, পরিণাম সম্পর্কে শিখতে এবং কীভাবে পারস্পরিক সম্পর্ক কাজ করে- এটি বুঝতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে বাচ্চাদের জন্য উপদেশমূলক শিক্ষাপদ্ধতি কোনো কাজে আসে এমন প্রমাণ নেই।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে