প্রায় ৮০০ বছর আগের একটি মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপির খোঁজ মিলেছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি লাইব্রেরিতে। আর তাতে উঠে এসেছে কিংবদন্তিতুল্য রাজা আর্থার ও যাদুকর মার্লিনের হারিয়ে যাওয়া কাহিনী।
ঘটনার শুরু ২০১৯ সালে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত একটি সম্পত্তি নথি পুনরায় তালিকাভুক্ত করার সময় গবেষকদের চোখে পড়ে নথিটির মলাটে। মলাটটি খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ১৩শ শতাব্দীর একটি বিরল পাণ্ডুলিপির খণ্ডাংশ— যাতে ফরাসি ভাষায় লেখা 'সুইট ভুলগেট দ্যু মার্লিন'।

ফরাসি ভাষায় লেখা পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ যা সময়ের সঙ্গে ঝাপসা বা মলিন হয়ে গেছে। ছবি: সিএনএন
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বছর আগ থেকে এটি কেবল একটি পুরনো দলিলের মলাট হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। যেন চোখের সামনেই কোনো গুপ্তধন জনসাধারণের চোখের আড়াল হয়ে ছিল!
গবেষকরা জানান, ১২৭৫ থেকে ১৩১৫ সালের মধ্যে উত্তর ফ্রান্সে ফরাসি ভাষায় হাতে লেখা হয়েছিল এই পাণ্ডুলিপি। তৎকালীন সময়ের কাগজ ও বই ছিল এতটাই দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান যে ১৬শ শতাব্দীতে এগুলোকে পুরনো দলিল বা বইয়ের মলাট হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
তবে কালের গহ্বরে চাপা পড়ে যাওয়া এ পাণ্ডুলিপির অক্ষরগুলো আজ আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে। মাল্টি-স্পেকট্রাল ইমেজিং ও সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে কোনো পৃষ্ঠা না ছিঁড়েই গবেষকরা পাণ্ডুলিপিটি ‘ডিজিটালভাবে’ উন্মোচন করতে সক্ষম হন। এর ফলে পাতাগুলো না খুলেই ও সেলাইয়ের ক্ষতি না করেই এর ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পড়া সম্ভব হয়।

বিভিন্ন মাত্রায় আলোর নানা তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করায় গবেষকরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে মলাটের ওপর লেখা দেখতে পেয়েছেন। ছবি: সিএনএন
এ পাণ্ডুলিপিতে গাওয়েইন, তার ভাই ও তাদের বাবা কিং লথের স্যাকসন রাজাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিবরণ পাওয়া গেছে। এতে তাদের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের বর্ণনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মার্লিনের বর্ণনাও। এই দৃশ্যে তিনি সুদর্শন এক বীণাবাদক সেজে কিং আর্থারের রাজদরবারে আবির্ভূত হন। দৃশ্যটিতে দেখা যায়, যাদুকর মার্লিন সেজে হার্প বাজিয়ে রাজা আর্থারের দরবারে প্রবেশ করছেন।
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির হস্তলিখিত দলিলবিষয়ক প্রধান ড. জেমস ফ্রিম্যান বলেন, এটি শুধুমাত্র সাহিত্যের মাত্রাতেই বড় আবিষ্কার নয়। বরং ইতিহাসের ভেতর নতুন জানালা খুলে দেয়ার মতো ব্যাপার!
এই আবিষ্কার কেবল কিং আর্থারের কাহিনীকে নতুন আলোয় দেখার সুযোগই তৈরি করেনি। বরং মধ্যযুগীয় সাহিত্য সংরক্ষণের প্রাচীন কৌশল ও আধুনিক প্রযুক্তির সম্মিলনের সম্ভাবনারও পথ দেখিয়েছে।
গবেষকদের আশা, এ প্রযুক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতে আরো বহু হারিয়ে যাওয়া কাহিনী উদ্ধার করা সম্ভব হবে। আর সে কাহিনীগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরবে সময়, সংস্কৃতি ও মানুষের গল্প—যেগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চাপা পড়ে ছিল কোনো মলাটের নিচে। —সিএনএন










