পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে অবস্থিত রোটনেস্ট দ্বীপটি স্থানীয়দের কাছে ‘রোট্টো’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপটি একটি নিরিবিলি অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিখ্যাত কোকা নামক মারসুপিয়াল প্রাণীর আবাসস্থল এই দ্বীপ আজ বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় এক গন্তব্য।
১৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে। দ্বীপটিতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিষিদ্ধ। ১৯৩১ সাল থেকেই বহাল আছে এই নিয়ম। দর্শনার্থীরা সাধারণত বাইসাইকেলে বা পায়ে হেঁটে বা সেগওয়ের মাধ্যমে দ্বীপ পরিভ্রমণ করেন। রোটনেস্টে রয়েছে ৬৩টি সৈকত ও ২০টি উপসাগর, যার প্রতিটিই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অধিকারী।
পর্যটন সুবিধার আধুনিকায়নের মধ্যেও দ্বীপের পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে রয়েছে গভীর দায়বদ্ধতা। এখানে উঁচু ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ এবং দ্বীপের সকল স্থাপনা সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। কৃত্রিম আধুনিকতা থেকে রক্ষা করেই দ্বীপটিকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে।
২০১৩ সালে হাফিংটন পোস্ট কোকাকে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী প্রাণী’ আখ্যা দিলে দ্বীপটির জনপ্রিয়তা হঠাৎ করেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রোটনেস্ট বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার কোকার আবাসভূমি। আন্তর্জাতিক তারকাদের কোকার সঙ্গে সেলফি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয় এবং দ্বীপের পর্যটক সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে।
তবে দ্বীপের ইতিহাস কেবল প্রকৃতি আর নির্জনতার গল্প নয়। ১৮৩৮ সালে রোটনেস্ট দ্বীপটি এক সময় আদিবাসীদের বন্দিশিবিরে রূপান্তরিত হয়েছিল। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে প্রায় চার হাজার আদিবাসী পুরুষ ও শিশু এখানে কারাবন্দি ছিলেন, যাদের অনেকেই অজান্তে তথাকথিত অপরাধে অভিযুক্ত হন। তাদের অনেকেই আর নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে পারেননি।
বর্তমানে এই ইতিহাসকে সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে ‘ওয়াজেমাপ প্রকল্প’ এবং দ্বীপে প্রতিষ্ঠিত ওয়াজেমাপ জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দ্বীপের আদিবাসী নাম ‘ওয়াজেমাপ’ যার অর্থ ‘প্রাণের জায়গা’—এই পরিচিতি ফিরিয়ে আনতেই জোরদার প্রচেষ্টা চলছে। দ্বীপজুড়ে ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াজেমাপ বিডি ট্রেইল তৈরি করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।
রোটনেস্টে টেকসই পর্যটনের একটি মডেল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তি ও সমুদ্রবায়ুর ব্যবহার, পানীয় জলের জন্য সমুদ্রের পানি পরিশোধন, সামুদ্রিক সংরক্ষণ এলাকা ও স্থানীয় উদ্ভিদ রক্ষায় নার্সারির মতো ব্যবস্থা দ্বীপটির পরিবেশ সচেতন মনোভাবের প্রমাণ। ২০২৩ সালে প্রণীত নতুন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় এ বিষয়গুলোকে আরও সুসংহত করা হয়েছে।
এখানে স্বল্পপ্রভাবপূর্ণ বিভিন্ন কার্যক্রম যেমন—স্নোরকেলিং, বাইসাইকেল ভ্রমণ, সেগওয়ে ট্যুর ইত্যাদি উপভোগ করা যায়। দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর দ্বীপের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হয় ৪০ হাজার ঘণ্টারও বেশি স্বেচ্ছাশ্রম।
রোটনেস্ট দ্বীপমাত্র নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক, পরিবেশগত সচেতনতার প্রতীক এবং ইতিহাসের এক জীবন্ত ধারক। এখানকার বাতাসে মিশে থাকা প্রশান্তি শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে গিয়ে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেয় পর্যটকদের।










