ঘুমানোর ম্যাট্রেসটি পুরনো হয়ে গেলে সবাই ঘর থেকে দূর করার কথাই ভাবেন। কিন্তু ফেলে না দিয়ে নিজের পুরনো বিছানাকে বানিয়ে ফেলতে পারেন সবুজের বিছানা। যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীর সহায়তায় জর্ডানের শরণার্থীরা পুরনো ম্যাট্রেসে চাষ করছেন তাজা শাক-সবজি। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে মরুভূমিতে ঘটিয়ে ফেলেছেন সবুজ বিপ্লব। ফলে এখন এ শরণার্থী শিবিরে পুরনো ম্যাট্রেসের চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ।

জর্ডানের জা’আতারি শরণার্থী শিবিরে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের বাস। শিবিরের গুদামে পড়ে আছে অন্তত ১০ হাজার পুরনো ম্যাট্রেস। শিবির এলাকাটি খুবই ছোট। তার ওপর এখানকার মাটি বেশ লবণাক্ত। রয়েছে পর্যাপ্ত পানির অভাব। এখানে চাষাবাদের কথা কল্পনাতেও ভাবেননি কেউ। কিন্তু যুক্তরাজ্যের এক গবেষক তাদের হাতে ধরিয়ে দেন জাদুর কাঠি। পরিত্যক্ত ম্যাট্রেসে শাক-সবজি চাষের কৌশল শেখান তিনি। জা’আতারি শরণার্থী শিবিরে খাদ্য উৎপাদনে ম্যাট্রেস এখন বিরাট ভূমিকা রাখছে। নরম ফোমের এই ম্যাট্রেসকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যেক শরণার্থী ঘরে ঘরে বাগান তৈরি করেছেন। বাগানে ফলছে সবজি ও ফল।

যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের প্রভাষক টনি রায়ান এ কৌশলের উদ্ভাবক ও প্রচারক। তিনি বলেন, পরিত্যক্ত ম্যাট্রেসগুলো নষ্ট করার কোনো উপায় নেই। এই নরম ফোমকে কীভাবে খাদ্য উৎপাদনে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে তিনি পরিকল্পনা করতে থাকেন। একদিন তিনি একটি আবর্জনা ফেলার জায়গায় দেখতে পান, পুরনো সোফার উপর একটি টমেটো গাছ জন্মেছে। এ থেকেই চমৎকার আইডিয়া পেয়ে যান। তখন তিনি পিএইচডি গবেষণা করছিলেন। সেসময় থেকেই শুরু করলেন পুরনো ম্যাট্রেসে সবজি চাষ নিয়ে গবেষণা।

যে কোনো আবহাওয়া বা তাপমাত্রায় ম্যাট্রেসে গাছ লাগানো যায়। স্থানীয় কৃষকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। ফোম যে পানি শোষণ করে ধরে রাখে তা থেকেই উদ্ভিদ আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পায়। মাটি থেকে যে পুষ্টি উপাদান উদ্ভিদ পেত তা পায় পানিতে মিশিয়ে দেয়া পুষ্টি উপাদান থেকে। মাটিতে ফসল আবাদের যে পরিমান পানির দরকার হয় তার প্রায় ২০ শতাংশ পানিতেই ফোমে চাষ করা যায়। অন্যদিকে ম্যাট্রেসে পানি প্রয়োজন অনুসারে নির্দিষ্ট স্থানে স্থির থাকে। ফলে কম পানিতেই ফসল ফললো সম্ভব। 

তবে মাটিতে ফসল ফলিয়ে অভ্যস্ত কৃষকদের ফোমে চাষ করানোটা খুব একটা সহজ ছিল না।  আবু ওয়াসেম নামের একজন সিরীয় কৃষক প্রথম সফলভাবে ফোমে সবজি উৎপাদন করতে সক্ষম হন। পরে তিনিই অন্য কৃষকদের এ জল-চাষ বিদ্যা সম্পর্কে উৎসাহিত করেন। এই বিদ্যা কাজে লাগিয়ে তিনি তার বাগানে কাঁচা মরিচ ও অন্যান্য সবজি চাষ করেছেন। সবার কাছে তিনি এখন ‘গ্রিন হ্যান্ড ম্যান’ নামে পরিচিত। তার এই নামের পেছনের রহস্য হলো, তিনি যেটাই চাষ করেন তাতেই সাফল্য আসে।

ওয়াসেম বলেন, প্রথম যখন আমরা এই শিবিরে আসি এটা ছিল একটা মরুভূমি। তারপর বিজ্ঞানীদের জল-চাষ বিদ্যা আমাকে অবাক করে। মনে মনে আমি বেশ খুশি হই। তারপর আমার ধ্যানজ্ঞান হয়ে গেল জল-চাষ বিদ্যা ব্যবহার করে মরুভূমিকে সবুজে পরিণত করা।

প্রক্রিয়াটি হলো- পুরনো প্লাস্টিকের কফি কাপ বা পাত্রে ম্যাট্রেসের টুকরা দিয়ে পূর্ণ করা হয়। পাত্রগুলো ছিদ্র করা থাকে যেন অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যেই রোপণ করা হয় গাছের চারা। চাইলে কেবল ম্যাট্রেসের টুকরার উপরেও লাগানো যায় গাছ। ম্যাট্রেস নষ্ট হয়ে গেলে তা পরিবর্তন করে দিতে হবে। নিয়মিত পুষ্টি মিশিয়ে দিয়ে হয় পানিতে। প্রতিদিন গাছে পানি স্প্রে করতে হয়।

এ পদ্ধতিতে একসঙ্গে দুটি লাভ: জমে থাকা পুরনো ম্যাট্রেসগুলোর পুনর্ব্যবহার এবং যেখানে লবণাক্ত মাটি ও পানির অভাবে সেখানেও কৃষিকাজ সম্ভব করে তোলা। 

সূত্র: বিবিসি