শিশুদের ইউটিউব চ্যানেলের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কোকোমেলন। এমনকি ভারতীয় গানের ইউটিউব চ্যানেল ‘টি- সিরিজ’ এর পর এই কার্টুন চ্যানেলটিই সবচেয়ে বেশি দেখা হয়, পাঁচ হাজার কোটি বার। মৃদুভাষী জে জিয়ন ও তার স্ত্রী ২০০৬ সালে শিশু শিক্ষার উদ্দেশ্যে শুরু করেন কোকোমেলন। বর্তমানে এর সাবস্ক্রিপশন সংখ্যা ৭২৮ কোটি। চ্যানেলটির ভিউ মাসিক ৩০০ কোটি, যা শিশুদের জনপ্রিয় ও আলোচিত চ্যানেল রায়ানস ওয়ার্ল্ডের চেয়ে তিনগুণ বেশি। 

তবে রায়ান কাজির মতো কোকোমেলনের ভিডিওতে কখনো চ্যানেলের পেছনের লোকদের ভিডিওতে দেখা যায় না। এমনকি তারা কখনোই জনসমক্ষে আসেন না। ফলে গণামধ্যমে তাদের ছবিও পাওয়া যায় না। এমনকি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ, স্পন্সর, ভিডিও অনুবাদ এবং ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধার প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। 

শিশুদের ছড়া ও গানের আসর বসে কোকোমেলনে। শুরুর দিকে চ্যানেলটির নাম ছিল এবিসি কিড টিভি। ২০১৩ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় দেটস মি অন টিভি। সবশেষে ২০১৮ সালে কোকোনাট ও ওয়াটারমেলন থেকে মিলিয়ে নাম রাখা হলো কোকোমেলন- নার্সারি রাইমস। চলতি মাসের হিসাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে এই ইউটিউব চ্যানেলটিই সর্বাধিকবার দেখা হয়েছে। আর এ দিক দিয়ে  বিশ্বে আছে তৃতীয় অবস্থানে। দ্বিতীয় অব্স্থানে আছে পিউ ডাই পাই।

কোকোমেলনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিও হলো বাথ সং ‘ওয়াশ মাই হেয়ার, ডু ডু ডু ডু ডু...’ । এটিই দেখা হয়েছে ২৩০ কোটিবার। এখান থেকে শিশুরা বাড়ির কাজ শেখে, নিজের কাজ নিজে করা শেখে। কেবল দু’জন মিলে কাজ করলেও এখন ২০ জন কর্মীর পরিশ্রমে তাদের শিশুতোষ চ্যানেলটি আজ বিশ্ব সেরা। এই চ্যানেলের মাসিক আয় ১ কোটি ১৩ লাখ ডলার।

সাবস্ক্রিপশনের দিক দিয়ে কোকোমেলনের পরে আছে লাইক নেসটি ভ্লগ, কিডস ডায়না শো, ভ্লাড অ্যান্ড নিকিতা,  চুচু টিভি নার্সারি রাইমস অ্যান্ড কিডস সংস ইত্যাদি।

গত সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষার লক্ষ্যে শিশুতোষ ইউটিউব চ্যানেলগুলোতে যেমন খুশি বিজ্ঞাপন দেয়া বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এর জন্য গুগলকে এরই মধ্যে মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হয়েছে। ফলে ১ জানুয়ারি থেকে এসব চ্যানেলে পার্সোনালাইজড বিজ্ঞাপন দেখানো বন্ধ করেছে ইউটিউব। এতে অনেক চ্যানেলের আয় ব্যাপকভাবে পড়ে গেছে। 

এ পরিস্থিতিতে শিগগিরই খেলনা ও শিশুদের ছড়ার অ্যালবাম বিক্রির ব্যবসায় নামার চিন্তাভাবনা করছে কোকোমেলন কর্তৃপক্ষ। কোকোমেলনের স্রষ্টা জে জিয়ন এবং তার স্ত্রী। ক্যালিফোর্নিয়ার আরভিনে বসবাসরত এ দম্পতি সব সময়ই পাদপ্রদীপের ছায়ায় থেকেছেন। জিয়নের স্ত্রী নাম প্রকাশেও অনিচ্ছুক। বর্তমানে ৫৫ বছর বয়সী জিয়ন একজন সাবেক বিজ্ঞাপন নির্মাতা। ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝিতে তিনি দক্ষিণ কোরিয়া থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি দেন। এরপর স্থানীয় আর্ট স্কুলে পড়ে শুরু করেন বিজ্ঞাপন নির্মাণের ব্যবসায়। দুজনে প্রথমে শিশুতোষ বই লিখতেন। এরপর অ্যানিমেটেড ভিডিও বানানোর পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামেন।

এ দম্পতি এখন চ্যানেলের জনপ্রিয় গানগুলোর অ্যালবাম বের করার পাশাপাশি কোকোমেলন খেলনা বিক্রির ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করেছেন। খেলনা প্রস্তুত করবে ক্যাবেজ প্যাচ কিডস এবং পোকেমন ডলের প্রস্তুতকার জ্যাজঅয়্যারস। জিয়ন আরো জানিয়েছেন, তারা একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণেরও চিন্তাভাবনা করছেন।

তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানানে রাজি হননি জিয়ন। ধারণা করা যায়, খেলনা ও চলচ্চিত্রে চ্যানেলের জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড চরিত্র শিশু জে জে থাকবে। ২০১৭ সাল থেকে জে জে তার বড় দুই ভাইবোন ও বাবা-মাকে নিয়ে প্রায় প্রতিটি ভিডিওতে হাজির থাকছে। 

ক্যালিফোর্নিয়ার আরভিনে জে জিয়নের মালিকানাধীন ট্রেজার স্টুডিও ইনকরপোরেশনের স্টুডিওতে কাজ করেন ২০ জন কর্মী, এদের বেশিরভাগই অ্যানিমেটর। এক একটি ৪০ মিনিটের ভিডিও নির্মাণে তাদের প্রায় দুই মাস সময় লাগে। সম্পূর্ণ থ্রিডি রেন্ডার্ড এসব ভিডিও চ্যানেলে আপলোড করা হয় কমপক্ষে চার মাস পরপর। 

জিয়ন বলেন, কোকোমেলনের আয় কমে গেছে। নতুন আইনের কারণে ইউটিউব ব্যক্তিনির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিয়েছে। তবে আয় কতো কমেছে তা তিনি বলতে রাজি হননি। তবে রায়ানস ওয়ার্ল্ডের অংশীদার প্রতিষ্ঠান পকেটওয়াচের সিইও ক্রিস উইলিয়ামস জানান, জানুয়ারি থেকে নতুন নীতি কার্যকর হওয়ার পর এ চ্যানেলের আয় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। 

বাণিজ্যিক চুক্তির চিন্তাভাবনা করলেও চ্যানেলে খুব একটা পরিবর্তন আনবেন না জিয়ন। তিনি, তার স্ত্রী ও দুই ছেলেও লাইমলাইটে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং জেজে এবং তার পরিবারই আগের মতো মূল চরিত্র থাকবে। জে জে ও তার পরিবারে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। জে জে হয়তো স্কুলে ভর্তি হবে, চরিত্রগুলোর মধ্যেও বৈচিত্র্য আসবে, যেখানে বর্তমানে সব চরিত্রই শ্বেতাঙ্গ।

এর বাইরে কোনো পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা নেই জিয়নের। তিনি বলেন, আমি কখনো জনপ্রিয়তার দিকে তাকাইনি। বা ইউটিউবে কীভাবে ভিউ বাড়ানো যায় সে চিন্তাও আমার মাথায় আসেনি। গল্পটাই আসল বলে আমি মনে করি। আমি এর বেশি ভিউয়ার আর চাই না। যা আছে তা নিয়ে ভালোই আছি।

সূত্র: ব্লুমবার্গ