বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যারা ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন, তাদের অধিকাংশের ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আজ আর দৃশ্যমান নয়। নষ্ট হয়ে যাওয়া হার্ডড্রাইভ, পরিত্যক্ত ই-মেইল অ্যাকাউন্ট, বন্ধ হয়ে যাওয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আর হারিয়ে যাওয়া মেমোরি কার্ডের সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রজন্মের অগণিত ছবি চিরতরে মুছে গেছে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এ সংকটের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ৪০তম জন্মদিন উপলক্ষে বিশের কোঠার সময়কার ছবি খুঁজতে গিয়ে অনেকেই নিরাশ হয়েছেন। ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ের স্মৃতি নেই বললেই চলে। ছাপা অ্যালবাম আর পরবর্তী জীবনের ডিজিটাল আর্কাইভের মাঝখানে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘ডিজিটাল শূন্যতা’। এ সংকট কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বৈশ্বিক ফটোগ্রাফি শিল্পে ঘটে যাওয়া দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এক কাঠামোগত ফলাফল।

২০০৫ সাল ডিজিটাল ক্যামেরা শিল্পের জন্য ছিল একটি মোড় পরিবর্তনের বছর। ক্যামেরা অ্যান্ড ইমেজিং প্রোডাক্টস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সে বছর ডিজিটাল ক্যামেরার এত সহজলভ্য হয়েছিল যে ফিল্ম ক্যামেরা কার্যত বাজার থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তীব্র প্রতিযোগিতায় দাম কমে আসে, মান উন্নত হয় আর মধ্যবিত্ত ভোক্তার নাগালে চলে আসে ডিজিটাল ক্যামেরা।
এর আগে এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফি ছিল ব্যয়সাপেক্ষ ও সীমিত। ফিল্ম, ডেভেলপিং ও প্রিন্ট—সব মিলিয়ে ছবি তোলা ছিল একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। ডিজিটাল প্রযুক্তি সেই কাঠামো ভেঙে দেয়। ছবি তোলার খরচ প্রায় শূন্যে নেমে আসে আর ভোক্তারা স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ ছবি ধারণ করতে শুরু করেন।
কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ হলেও, দীর্ঘমেয়াদি ডেটা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ভোক্তাদের জ্ঞান ও সচেতনতা ছিল সীমিত। আজ স্মার্টফোন ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গেই ক্লাউডে ব্যাকআপ পাঠায়। সে সময় সাধারণ ব্যবহারকারীর ছবি ছড়িয়ে ছিল ডিজিটাল ক্যামেরা, এসডি কার্ড, সিডি, এক্সটারনাল হার্ডড্রাইভ, ইউএসবি স্টিক ও ফ্লিপ ক্যামেরার মতো মাধ্যমে। একই সময়ে ল্যাপটপ কম্পিউটার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যা ডেস্কটপের তুলনায় বহনযোগ্য হলেও ক্ষয়ক্ষতি ও চুরির ঝুঁকি বেশি ছিল।

২০০৭ সালে আইফোন বাজারে আসার পর স্মার্টফোন ফটোগ্রাফি শিল্পে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনে। তবে তার আগের কয়েক বছরে তোলা ছবির বড় অংশ নিরাপদভাবে স্থানান্তর বা ব্যাকআপ করা হয়নি। ডিভাইসের বদল আর ডিজিটাল সেবা আসা-যাওয়ার মধ্যে অগণিত ছবি হারিয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়টি একটি স্পষ্ট ‘ডিজিটাল ব্ল্যাক হোল’, সেসময় বিপুলসংখ্যক ছবি হারিয়ে গেছে।
একই সময়ে উত্থান ঘটে বিনা মূল্যের অনলাইন ছবি সংরক্ষণ ও শেয়ারিং সেবার। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মাইস্পেস ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পরে ফেসবুকের উত্থানে মাইস্পেস গুরুত্ব হারায়। ২০১৯ সালে মাইস্পেস জানায়, দুর্ঘটনাবশত সার্ভার ক্র্যাশে ২০১৬ সালের আগের সব ছবি ও ভিডিও মুছে গেছে।
কোডাক, শাটারফ্লাই, স্ন্যাপফিশসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান বিনা মূল্যে অনলাইন ফটো গ্যালারি সেবা চালু করেছিল। শুরুতে এটি প্রিন্ট ও ফটো পণ্যের বিক্রির মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে স্টোরেজ ব্যয় বহন করা অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ক্লাউডভিত্তিক সেবাগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। ডিজিটাল ছবি মূলত ডেটা—যা প্রযুক্তিগত ত্রুটি, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত বা সাইবার ঝুঁকিতে হারিয়ে যেতে পারে।
সমাধান হিসেবে পেশাদার ফটো ম্যানেজাররা ‘৩-২-১’ নীতি অনুসরণের পরামর্শ দেন। এর অর্থ প্রতিটি ছবির তিনটি কপি, দুই ধরনের মাধ্যমে সংরক্ষণ আর একটি কপি ভিন্ন ভৌগোলিক স্থানে রাখা।
বিবিসি অবলম্বনে










