​সময়ের কর্কশ হাত যখন স্মৃতির মলাট ছিঁড়ে ফেলে, তখন কিছু মানুষ বেঁচে থাকেন ইতিহাসের গভীর ক্ষতচিহ্নে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সেই অমোঘ অস্তিত্বের নাম। ১৯৪৩ সালে গাইবান্ধার গোটিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে বগুড়া ও ঢাকার আলো-বাতাসে তার বেড়ে ওঠা যেন এক দীর্ঘ মহাকাব্যিক পথচলা। ১৯৪৭-এর দেশভাগ আর ৫২-র ভাষা আন্দোলনের মতো উত্তাল সময়গুলো শৈশবে প্রত্যক্ষ করেছেন। ইতিহাসের বড় এসব ঘটনা তার মনোজগৎ গঠনে অবিনাশী কারিগর হিসেবে কাজ করেছিল। আর সেই কারণেই তিনি সাধারণ মানুষের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা হাজার বছরের পুরনো যন্ত্রণা আর হাহাকারকে অস্তিত্বের গূঢ় দর্পণ দিয়ে পাঠ করতে পেরেছিলেন।

৪ জানুয়ারি, আমাদের জরাগ্রস্ত ক্যালেন্ডারে এটি কেবল একটি প্রয়াণের তারিখ নয় বরং বাংলা কথাসাহিত্যের সেই মাহেন্দ্রক্ষণকে ফিরে দেখার দিন, যখন সাহিত্য তার নিরাপদ ‘ভদ্রলোকী’ খোলস ভেঙে ইতিহাসের নর্দমা আর মানুষের ঘামের ভেতর থেকে শিল্পের নির্যাস খুঁজে নিয়েছিল। ইলিয়াস আমাদের শিখিয়েছেন, ইতিহাস কেবল রাজরাজড়াদের জয়ের গল্প নয়, বরং তা সাধারণ মানুষের সেই না বলা দীর্ঘশ্বাস, যা মাটির নিচে আগ্নেয়গিরির মতো জমে থাকে। তিনি ছিলেন সেই মহাকালের সুদক্ষ শল্যবিদ, যিনি শব্দ আর বাক্যের ব্যবচ্ছেদে আমাদের অস্তিত্বের শেকড়কে উন্মোচিত করেছেন।

​ইলিয়াস বিশ্বাস করতেন, মানুষ শুধু রক্ত-মাংসের একক শরীর নয়, বরং সে তার পূর্বপুরুষের জমা রাখা স্মৃতি, রাজনীতি আর মাটির গভীরে মিশে থাকা এক জটিল শিকড়। তার জীবনদর্শন ছিল শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পক্ষে, কিন্তু ইলিয়াসের কলমে তা স্লোগান হয়ে নয়, বরং চিরন্তন মানবিক সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে। তার সাহিত্যকর্মের প্রতিটি ধাপে দেখা যায় গভীর ধ্রুপদী বুনন। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ (১৯৭৬) বাংলা ছোটগল্পের গতানুগতিক ধারাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। এরপর ‘দুধভাতে উৎপাত’ (১৯৮৫) এবং ‘খোঁয়ারি’ (১৯৮৯) সংকলনে তিনি দেখিয়েছেন সমাজের অবহেলিত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা। ‘দোজখের ওম’ (১৯৮৯)-এ ফুটে উঠেছে নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ও যন্ত্রণা। আর তার মৃত্যুর বছরে প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন ‘জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল’ (১৯৯৭) যেন তার শিল্প-দর্শনের চূড়ান্ত শিখর, যেখানে স্বপ্ন ও বাস্তবতার সীমানা মুছে গিয়ে এক পরাবাস্তব জগৎ তৈরি হয়েছে।

​ইলিয়াসের দুটি কালজয়ী উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দুটি স্বতন্ত্র হিমালয় সদৃশ স্তম্ভ। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ (১৯৮৬) উপন্যাসে তিনি ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে শহর ও গ্রামের মানুষের যে মিলন ঘটিয়েছেন। এটিকে রাজনৈতিক উপন্যাসের এক আদর্শ পাঠশালা বলা যায়। এখানে ‘খিজির’ কেবল একজন ভবঘুরে নয়, বরং সে হয়ে ওঠে ইতিহাসের সেই অবদমিত শক্তি, যা যেকোনো গণবিস্ফোরণের মূল চালিকাশক্তি। অন্যদিকে ‘খোয়াবনামা’ (১৯৯৬) উপন্যাসটি কোনো বিদেশী তত্ত্বের নকল নয়; এটি তেভাগা আন্দোলন ও দেশভাগের ক্ষতবিক্ষত পটে আঁকা এমন এক মহাকাব্য, যা পশ্চিমা ধ্যান-ধারণাকে অস্বীকার করে এ দেশের নিজস্ব লোকজ বিশ্বাস ও পুরাণকে আঁকড়ে ধরেছে। এ উপন্যাসে তিনি প্রমাণ করেছেন বাংলার নিভৃত পল্লীর একজন ভূমিহীন কৃষকের স্বপ্নের ভেতরেও হাজার বছরের ইতিহাস ও বিদ্রোহ লুকিয়ে থাকে। তার একমাত্র প্রবন্ধ সংকলন ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’ আমাদের চিন্তা-ভাবনার সীমাবদ্ধতা ও সাংস্কৃতিক সংকটের রূপটি নির্মোহভাবে ধরিয়ে দেয়।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইলিয়াসের তুলনা করতে গেলে জেমস জয়েস, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস কিংবা ফ্রানজ কাফকার কথা স্মরণে আসে। জয়েস যেমন তার ডাবলিনের খুব সরু, আঁকাবাঁকা বা দুর্গম রাস্তাগুলোকে বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে অমর করেছেন, ইলিয়াসও তেমনি ঢাকার পুরান জনপদ আর উত্তরবঙ্গের জনজীবনকে একই উচ্চতায় তুলে এনেছেন। তবে মার্কেসের ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ বা জাদু-বাস্তবতা যখন ইলিয়াসের কলমে আসে, তখন তা বিদেশী অলঙ্কার না হয়ে, হয়ে ওঠে বাংলার চিরন্তন ‘মিথ’ বা লোকগাথা। কাফকার রূপান্তরের বেদনা তার গল্পে মিশে যায় শোষিত মানুষের ক্রোধে। পার্থক্য শুধু এই যে ইলিয়াস বিমূর্ত ভাবনার চেয়ে মাটির গন্ধ আর রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি লাতিন আমেরিকান লেখকদের মতো বর্ণাঢ্য ছিলেন না, বরং ছিলেন বাংলার মাটির মতো শুষ্ক কিন্তু ভেতরে এক অগ্নিকুণ্ড ধারণকারী।

​শৈল্পিক বিচারে ইলিয়াসের লেখার গঠন ছিল এক দুঃসাহসিক বিদ্রোহ। তার বাক্যগুলো ছিল দীর্ঘ ও কিছুটা জটিল। তিনি মনে করতেন, জীবন যেহেতু সহজ নয় এবং ইতিহাস যেহেতু হাজারো ষড়যন্ত্রে বন্দি, তাই সেই সত্যকে প্রকাশের ভাষাও খুব মসৃণ হতে পারে না—এটিই ছিল তার শৈল্পিক সততা। ‘রেইনকোট’ গল্পের সেই মনস্তাত্ত্বিক চাপ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সংকটের সময়ে নীরবতাও এক ধরনের যুদ্ধ। চলচ্চিত্রে ‘মেঘমল্লার’ হিসেবে এ গল্পের রূপান্তর তার সৃষ্টির আন্তর্জাতিক আবেদনেরই প্রমাণ দেয়।

​ইলিয়াসের প্রাসঙ্গিকতা বর্তমানেও ফুরিয়ে যায়নি। বরং তা এক অনিবার্য প্রয়োজনীয়তায় রূপ নিয়েছে। আমরা আজ এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ইতিহাসকে পণ্য হিসেবে সাজিয়ে দেখানোর মহোৎসব চলে। আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতির চাপে মানুষ যখন নিজের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তখন ইলিয়াস আমাদের শিখান কীভাবে মাটির গভীরে শিকড় চরিয়ে দিয়ে প্রতিকূলতার মোকাবেলা করতে হয়। সমকালীন রাজনৈতিক বিভেদ এবং সামাজিক বৈষম্যের যে চিত্র আমরা দেখি, তার ব্যবচ্ছেদ ইলিয়াস কয়েক দশক আগেই করে গিয়েছেন। তার সাহিত্য আমাদের নিজের পরিচয় খোঁজার শক্তি দেয় এবং শেখায় যে প্রান্তিক মানুষের কথা না বললে কোনো জাতির মুক্তি সম্ভব নয়।

​উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। ক্যান্সারের অসহ্য যন্ত্রণা সয়েও তিনি যেভাবে ‘খোয়াবনামা’র প্রতিটি লাইনকে নিখুঁত করেছেন, তা শিল্পের প্রতি এক চূড়ান্ত আত্মোৎসর্গের উদাহরণ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি যেভাবে সাহিত্যের প্রতি সমর্পিত ছিলেন, তা যেকোনো সংগ্রামী মানুষের জন্য পরম অনুপ্রেরণা। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার কিংবা কলকাতার আনন্দ পুরস্কারের চেয়েও বড় সত্য হলো আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আজ বাংলা সাহিত্যের এক অবিচ্ছেদ্য বিশ্বজনীন মানদণ্ড। ৪ জানুয়ারি এ মহৎ শিল্পীর প্রয়াণ তিথিতে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তিনি চলে গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া প্রতিটি পঙ্‌ক্তি আজও আমাদের শিখিয়ে দেয়—কীভাবে ইতিহাসের আঁস্তাকুড় থেকেও অমরত্বের পদ্মফুল ফুটিয়ে তুলতে হয়।

বাহাউদ্দিন গোলাপ: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়