ব্রিটিশ লেখক ও এনএইচএস সাইকোথেরাপিস্ট মোইয়া সারনার অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, বছরের পর বছর থেরাপির পর তিনি উপলব্ধি করেন, নিজের আচরণ ও চাহিদার পেছনে আসলে কাজ করছিল এক আয়নার মতো আত্মপরিচয়— যা গঠিত হয়েছিল শুধুই অন্যের প্রত্যাশা মেটাতে গিয়ে। নিজস্ব সত্তা, পছন্দ কিংবা আকাঙ্ক্ষা নয়—তিনি হয়ে উঠেছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যা অন্যরা তার কাছে প্রত্যাশা করে।
সারনার মতে, ‘পিপল-প্লিজার’ শব্দটি নারীদের ক্ষেত্রেই বেশি ব্যবহৃত হয়। সমাজ যেভাবে মেয়েদের সামাজিকীকরণ করে, সেখানে নিজের প্রয়োজনকে গৌণ করে অন্যের সন্তুষ্টিকেই অগ্রাধিকার দেয়ার একটি মানসিক কাঠামো তৈরি হয়। তবে এই প্রবণতা কেবল নারীদের নয়, পুরুষদের মধ্যেও গভীরভাবে বিরাজমান।
মনোবিশ্লেষক ডোনাল্ড উইনিকটের তত্ত্ব অনুযায়ী, শিশুকালে যদি অভিভাবকরা শিশুর প্রকৃত আবেগ ও চাহিদা গ্রহণে অক্ষম হন, তাহলে শিশু নিজের আসল সত্তাকে চেপে রেখে মিথ্যা আত্মপরিচয় তৈরি করতে বাধ্য হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মিথ্যা সত্তাই হয়ে ওঠে জীবনের মানদণ্ড—একজন মানুষ হয়ে ওঠেন নিজেরই মিথ্যা এক সংস্করণ।
সারনার ভাষ্য অনুযায়ী, এমন মানুষরা নিজেরা অনেক সময় বুঝতেও পারেন না যে তাদের অভ্যন্তরে কী চলছে। শুরুতে মনে হতে পারে, এটি একধরনের সচেতন সামাজিক সৌজন্য। কিন্তু এটি আসলে অবচেতনভাবে নিজের ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকে অন্যের প্রত্যাশা অনুযায়ী ঢেলে সাজানোর এক দীর্ঘ অভ্যাস— যার ফলে ভেতরে তৈরি হয় ফাঁপা এক শূন্যতা।
তবে উপলব্ধি আত্ম অনুসন্ধানের পথও খুলে দেয়। সারনার অভিজ্ঞতায়, নিজের সেই চাপা পড়ে থাকা ভয়, ক্ষোভ, দুর্বলতা, এমনকি অহংকারকে স্বীকার করে নিতেই দেখা যায় সহানুভূতি, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের নতুন রূপ। নিজের মধ্যে জন্ম নেয় নতুন এক দৃঢ়তা— যা অবশেষে তাকে দেয় সত্যিকারের ‘আমি’ হয়ে ওঠার শক্তি। তিনি বলেন, ‘নিজের ভিতরের দানবগুলো এখন আর আমাকে ততটা ভয় দেখায় না। কারণ আমি এখন জানি, আমি কে।’
এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সবাইকে খুশি রাখতে চাওয়ার মতো আপাত নিরীহ অভ্যাসটি আসলে অনেক গভীর এক মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা ও আত্মপরিচয় সংকটের জন্ম দিতে পারে। এবং তা শুধুই ব্যক্তি নয়, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও পারিবারিক গঠনেরও প্রতিফলন।










