উহান করোনাভাইরাসের উৎস নিয়ে এখনো ধন্দে আছেন বিজ্ঞানীরা। খাওয়ার জন্য যে বন্যপ্রাণীর বাজার থেকে এ ভাইরাস ছড়িয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে সেটি এরই মধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এমনকি পুরো উহান শহরই এখন আক্ষরিক অর্থে তালাবন্দি। ফলে অনুমান যাচাইয়ের কোনো সুযোগও নেই। তবে ভাইরাসের বাহক হিসেবে শুরুতেই বাঁদুরের নাম উঠে আসে। এরপর দ্বিতীয় বাহক হিসেবে সাপের কথা বলা হলেও অধিকাংশ বিজ্ঞানী তা নাকচ করে দেন।

সে যাই হোক অধিকাংশ মারাত্মক ভাইরাসের বাহক হিসেবে বারবার বাঁদুরের নাম উঠে এসেছে। গত ২৯ জানুয়ারি বিজ্ঞান সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে চীনের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের অধ্যাপক গিঝেন উ বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক পোষক হিসেবে বাঁদুর যেসব ভাইরাস বহন করে সেগুলোর সঙ্গে নতুন করোনাভাইরাসের বৈশিষ্ট্য সঙ্গতিপূর্ণ।

বাঁদুরকে বলা হয়, ‘ভয়ঙ্কর জৈব খলনায়ক’। পাখাবিশিষ্ট এ স্তন্যপায়ী মারবার্গ, নিপাহ এবং হেন্ড্রার মতো প্রাণঘাতি ভাইরাসের বাহক। এ প্রাণী থেকে মানুষে রোগ সংক্রমণের ঘটনা বেশি। এক দশকের মধ্যে উগান্ডা, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় এসব রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এছাড়া ইবোলা, র‌্যাবিস, সার্স এবং মার্স ভাইরাসের প্রাকৃতিক পোষকও বাঁদুর। চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসটিও কিন্তু সার্স ও মার্স ভাইরাসের মতোই। 

অবশ্য এসব ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে কখনো কখনো মধ্যবর্তী বাহকও থাকে। যেমন ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস বাঁদুর থেকে সিভেট ক্যাট (খাটাশ) থেকে মানুষে ছড়িয়েছিল। এছাড়া ২০০০ সালের দিকে মার্স ভাইরাস ছড়িয়েছিল উটের মাধ্যমে। 

এ ধরনের ভাইরাসকে বিজ্ঞানীরা বলেন জুনোটিক। কারণ এরা পশু থেকে মানুষে ছড়ায়। এর মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ খুব ভয়ঙ্কর। মারাত্মক এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহ পর্যন্ত হতে পারে। খেজুরের রসে এ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছে। মূলত বাঁদুরের মূত্র ও লালা থেকেই খেজুর রসে এ ভাইরাস মিশে যায় বলে মনে করা হয়। কারণ বাঁদুর সাধারণত রস লাগানো খেজুর গাছের কাছাকাছি কোনো বড় গাছে ঝুলে থাকে।

অনেকে ধারণা করছেন, চীনা অশ্বখুর মুখো বাঁদুর নতুন করোনাভাইরাসের বাহক। চীনে এটি বাঁদুরের একটি সাধারণ প্রজাতি।

মারাত্মক ভাইরাসের বাহক বাঁদুরই কেন? এর ব্যাখ্যায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাঁদুরের অনেক প্রজাতি রয়েছে, ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি। তীক্ষ্ণদন্ত স্তন্যপায়ীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রজাতি এটি। এন্টার্কটিকা বাদে সব মহাদেশেই ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির বাঁদুর রয়েছে। স্থলচর প্রাণীর মধ্যে বাঁদুরের জীবনকাল তুলনামূলক বেশি এবং একসঙ্গে অনেকগুলো এমনকি লাখ লাখ বাঁদুরও কোনো গুহায় ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করতে দেখা যায়। এ কারণেই এদের ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি এবং দ্রুতই পুরো দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। 

বেশ কয়েকটি  মারাত্মক ভাইরাসের বাহক বা পোষক হলেও কিন্তু একমাত্র র‌্যাবিস ছাড়া এসব ভাইরাস বাঁদুরের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এক্ষেত্রে একটা তত্ত্ব আছে যে, স্তন্যপায়ী হলেও উড়তে পারাটাই বাঁদুরের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য যা তাকে অনেক কিছু থেকেই রক্ষা করে। উড়ার সময় বাঁদুরের বিপাক ক্রিয়া এবং শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে। এটি মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ীর জ্বর হলে যেমন হয় তেমনই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এ বৈশিষ্ট্য বাঁদুরের শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়েছে, ফলে ভাইরাসের প্রতি তাদের শরীর বেশ সহনশীল। 

তবে মারাত্মক রোগজীবাণু মানুষের দেহে ছড়ানোরা জন্য প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র বাঁদুরই দায়ী এমন নয়। ইঁদুর থেকে প্লেগ এবং শিম্পাঞ্জি থেকে এইচআইভি ভাইরাস মানুষের দেহে ছড়ায়।

তারপরও ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, অন্য যেকোনো প্রাণী প্রজাতির চেয়ে বাঁদুর বেশি বিপজ্জনক ভাইরাস বহন করে। ১৮৮টি জ্ঞাত জুনোটিক ভাইরাসের আচরণ নিয়ে করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের চেয়ে বাঁদুরই এসব ভাইরাস প্রজাতির মধ্যে বেশি সংখ্যকের বাহক বা পোষক। 

এমন পর্যবেক্ষণ নিয়ে অবশ্য কিছু বিজ্ঞানী প্রশ্নও তুলেছেন। কারণ ভাইরাসের পোষক হিসেবে বাঁদুরকে সন্দেহ করা এবং এ নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা শুরু হয়েছে ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর। ফলে একই প্রজাতির অন্যান্য ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে অন্য কোনো এক বা একাধিক প্রাণী প্রজাতির আরো বেশি ভূমিকা যে থাকতে পারে না সেটি কিন্তু এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারেন না বিজ্ঞানীরা। 

তবে যাই হোক, দ্রুত নির্বিচারে বন নিধন এবং নগরায়নের কারণে বাঁদুরের আবাস নষ্ট হচ্ছে। তারা জনবসতি এলাকায় মানুষের সংস্পর্শে চলে আসছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা যেমন চীন, বাংলাদেশ, ভারত এসব দেশে মানুষ দিনের অধিকাংশ সময় পরস্পরের কাছাকাছি বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে বাঁদুর ও অন্যান্য বন্যপ্রাণির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শেও চলে আসছে মানুষ। এতে করোনাভাইরাসের মতো মারাত্মক জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়া ও মহামারীর আশঙ্কা বাড়ছে।

সূত্র: সিএনএন