যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাচা জন জে ট্রাম্প। এই চাচার নাম প্রায় প্রায়ই বলেন তিনি। এই করোনা মাহমারীর কালে আরো বেশি করে চাচাকে স্মরণ করছেন তিনি। এই জিনিয়াস চাচার মেধার জন্য যে জিনের ভূমিকা রয়েছে সেই জিন বহন করেন বলে নিজেকেও ‘স্মার্ট’ দাবি করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্পের এই চাচা গত শতকের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুমান ও রোনাল্ড রিগ্যানের পাশাপাশি ব্রিটেনের রাজা ষষ্ঠ জর্জের কাছ থেকেও পদক পেয়েছেন। রাডার প্রযুক্তির বিকাশে তার গবেষণা ও কাজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

জন ট্রাম্প ১৯০৭ সালে নিউইয়র্কের তৎকালীন অভিজাত ট্রাম্প পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাদার নাম ফ্রেড ট্রাম্প। জন ট্রাম্পের বয়স যখন ১১ বছর তখন ১৯১৮ সাল। ইউরোপ আমেরিকাজুড়ে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে স্প্যানিশ ফ্লু। এই ফ্লুতেই মারা যান ফ্রেড ট্রাম্প। জন ট্রাম্পের বড় ভাইয়ের নাম ফ্রেড ট্রাম্প জুনিয়ন, তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের হবু প্রেসিডেন্টের বাবা।

জন ও ফ্রেড একসঙ্গেই বেড়ে ওঠেন। জন কলেজের পাঠ চুকিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ক্যারিয়ার গড়ার মনস্থির করেন এবং পারিবারিক ব্যবসা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেন। আর বড় ভাই ফ্রেড রিয়েল এস্টেট ব্যবসার দিকে মনোনিবেশ করেন। 

ব্রুকলিনের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাসাচুসেট ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) পড়াশোনা শেষে ম্যাসাচুয়েট স্কুলে চাকরি শুরু করেন জন। সেখানেই তিনি পরবর্তী চার দশক বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে কাজ করেন। 

জন ট্রাম্পের সেই সময়কার একটি সম্ভাবনাময় তত্ত্ব ছিল ত্বকে ইলেকট্রন বিম প্রয়োগ করে ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করা সম্ভব। তিনি দাবি করেছিলেন, শক্তিশালী ইলেকট্রন বিম ব্যবহার করে রক্তের প্লাজমায় হেপাটাইটিস ভাইরাস ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব। অনেকটা বর্তমানের ক্যামো বা রেডিও থেরাপির মতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে জন এই পরীক্ষা কারো ওপর প্রয়োগ করার সুযোগ পাননি। কারণ কেউ এর জন্য স্বেচ্ছাসেবী হতে রাজি হয়নি। 

এ প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পর জন একটি ২০ লাখ ভোল্টের মেশিন তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন। মেশিনটি ক্যান্সার রোগীদের বিশেষত যাতের টিস্যুগুলো রক্ষা করার জন্য শক্তিশালী এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ণভাবে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাদের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে এটি ছিল তার অন্যতম বৃহৎ সাফল্য।

এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে সামরিক বাহিনী থেকে ডাক পড়ে। শত্রুপক্ষে যোগাযোগ বিপযয় ঘটাতে  সক্ষম এক বিশেষ ধরনের জ্যামিং ডিভাইস তৈরি করেন তিনি। এতে দারুণভাবে লাভবান হয়েছিল মার্কিন বাহিনী। তার কাজটিকে এতটা মূল্যবান বিবেচিত হয়েছিল যে ইউরোপে গিয়ে ডিভাইসগুলোর পরিচালনা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা করেছিলেন জন। বলতে গেলে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধজয়ের অন্যতম হাতিয়ার ছিল এই রাডার প্রযুক্তি।

জন ট্রাম্প পরবর্তীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে তার বৈজ্ঞানিক প্রতিভা কাজে লাগিয়েছিলেন। তার এই উদ্ভাবন নিয়ে ওই সময় বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেসে (এপি) ‘স্যুয়েজ স্লাজ প্রবলেম সলভড’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিবেদনটিতে জনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, তিনি চিন্তা করেছিলেন এ উদ্যোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছিলেন, ইলেকট্রন ব্যবহার করে আবর্জনার ড্রেনে বসবাসকারী অনুজীবগুলোকে কীভাবে ধ্বংস করা যায়। এই উদ্ভাবন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল।

অবশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরাবরই তার চাচার দাবির ‘ভুল’ ব্যাখ্যা করেছেন। এর আগে তিনি টুইটারে বলেছিলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জলবায়ু পরিবর্তনে তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে ধারণা নিয়ে পড়ে আছে- তা একটি ভাঁওতা।

জলবায়ু পরিবর্তনের গবেষণা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ‘এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো যাবে না’। এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, ‘না না। কেউ কেউ তা বলেন এবং কেউ কেউ অন্যরকমও বলেন। মানে দুই দিকেই বিজ্ঞানীদের সমর্থন পাওয়া যাবে। আমার চাচা বহু বছর ধরে এমআইটির একজন নামকরা অধ্যাপক ছিলেন। এ বিষয়ে তার সঙ্গে আমার কথা হয়নি। তবে আমার মধ্যে বিজ্ঞানের একটি সহজাত প্রবৃত্তি আছে এবং আমি বলবো উভয় ধারণাতেই বিজ্ঞানীদের সমর্থন রয়েছে।

যদিও নাসার মতে, প্রকৃতপক্ষে ৯৭ শতাংশ জলবায়ু বিজ্ঞানী সম্মতি দিয়েছেন যে অতিমাত্রায় মানুষের ক্রিয়াকলাপের জন্য পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে ট্রাম্পের মতো সন্দেহ করেন পিন্সটনের পদার্থবিদ উইলিয়াম হ্যাপারও। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, পৃথিবী উল্লেখযোগ্য উষ্ণ হচ্ছে- এ গবেষণার বিষয়ে তিনি সন্দেহ করেন। 

একবার ট্রাম্প হ্যাপারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি তার চাচা জন ট্রাম্পকে চেনেন কিনা। হ্যাপারের ইতিবাচক জবাবে প্রেসিডেন্ট অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। 

তবে হ্যাপার বলেন, বিষয়টি (জলবায়ু পরিবর্তন) নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের খুব গভীর জ্ঞান ছিল বলে আমার মনে হয়নি। তবে সম্ভবত তিনি তার চাচার কাছে এ বিষয়ে শুনেছিলেন। 

চাচার জিন তাকে বৈজ্ঞানিক প্রতিভা দিয়েছে ট্রাম্পের এমন বিশ্বাসের বিষয়ে হ্যাপার বলেন, আত্মীয়-স্বজনরা একে অপরের থেকে আলাদা। অবশ্য এর মানে সবই আলাদা- এটা আমি মনে করি না।

১৯৮৫ সালে জন ট্রাম্পের মৃত্যু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ৪০তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড রিগ্যান ওষুধ, শিল্প ও পরমাণু পদার্থবিজ্ঞানে আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের জন্য নতুন যন্ত্র ও পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য তাকে মরণোত্তর জাতীয় বিজ্ঞান পদকে ভূষিত করে। 

জন ট্রাম্পের মৃতুর পর সাবেক ব্যবসায়ীক অংশীদার ডেনিস রবিনসন একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেই লেখার মধ্যেই জন ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠেছে। ওই প্রবন্ধে জনকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে তাতে বুঝা যায়, বিরোধীদের প্রতি আগ্রাসী আচরণ, অপ্রমাণিত চিকিৎসা ও অদ্ভূত সব ধারণার প্রবক্তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুলনায় স্পষ্ট বিপরীত বৈশিষ্ট্যেরই ছিলেন তিনি।

জন ট্রাম্প সবার প্রতি সদয় ও বিবেচক মানুষ ছিলেন। এমনকি অত্যন্ত মানসিক চাপের মধ্যে থাকলেও তিনি কখনো কাউকে হুমকিধমকি দেননি বা অহঙ্কার দেখাননি। আপাতদৃষ্টিতে তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী এবং শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন।

ওয়াশিংটন পোস্ট অবলম্বনে

>> বিজ্ঞানী চাচার অনুরূপ জিনই ট্রাম্পকে এতো প্রতিভাবান বানিয়েছে!