নিউইয়র্ক এখন মৃত্যুপুরী। নাইন ইলেভেন সন্ত্রাসী হামলার পর সর্বাধিক প্রাণহানির সাক্ষী হলো এ শহর। এই শহরেরই বাসিন্দা মোহাম্মদ জাফর। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এ বাংলাদেশী নিউইয়র্কে ক্যাব চালান বহুদিন ধরেই। তার গল্পটি মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। এর যথেষ্ট কারণও আছে। আর দশটা ক্যাব চালকের চেয়ে তার গল্পটা অনেকখানি আলাদা।

সংসার ও সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় সঙ্কুলান করতে ইয়েলো ক্যাবের চালক হোন জাফর। ক্যাব চালিয়েই বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পড়াচ্ছেন তিনি। বলতে গেলে ‘আমেরিকান ড্রিমের’ প্রায় ষোলো আনাই পূর্ণ করেছেন তিনি। 

গত ১ এপ্রিল নভেল করোনাভাইরাস তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন এ সংগ্রামী মানুষটি। ব্রোঙ্কসের গানহিল রোডের একটি অ্যাপার্টমেন্টে রেখে গেছেন তিনটি এতিম সন্তান।

জাফরের জীবনের গল্পটি শুধু এমন ট্র্যাজেডিতেই শেষ নয়। তিনি একজন সফল মানুষও, সেই অর্থে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছিলেন এবং সারা জীবন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন তা বৃথা যায়নি। 

নিউইয়র্ক শহরে প্রচুর ইয়েলো ক্যাব চলে। প্লেক্সিগ্লাসের ওপারের চালকটিকে হয়তো কোনো যাত্রীই সেভাবে খেয়াল করার দরকার মনে করেন না। কারণ আরোহীর কাছে সব চালক একই। কিন্তু না, জাফর তাদের থেকে আলাদা। তার দিন শুরু হয় মেয়ে সাবিহাকে স্কুলে নামিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। ম্যানহাটনের পশ্চিমাংশে মর্যাদাপূর্ণ ট্রিনিটি স্কুলের সেকেন্ড গ্রেডে পড়ে সাবিহা। সারাদিন ক্যাব চালিয়ে আবার মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন জাফর।

সফলতার সিঁড়ি থেকে জাফরের কোনো সন্তানই বিচ্যুত হয়নি। বড় ভাই মাহতাবের মতোই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে সাবিহা। মাহতাব পড়েন হাভার্ড ইউনিভার্সিটিতে। পড়ার বিষয় অর্থনীতি ও ইতিহাস। 

বাবার বিষয়ে মাহতাব শিহাব সিএনএনকে এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি সারাজীবন খেটেছেন এবং অনেক কিছু থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেছেন। তিনি এমন কোনো কাজ করতেন না যা অত্যন্ত লাভজনক বা অঢেল উপার্জনের সুযোগ আছে এমন। তিনি ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করেছেন। ডেলিভারিম্যান হিসেবেও এক সময় কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন একজন ক্যাব চালক। কিন্তু সব সময় একটা জিনিস নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন যে এখানে এবং বাংলাদেশে তার পরিবার যেন অভাব অনটনে না থাকে। তিনি সারাজীবন এভাবে ত্যাগ করে গেছেন।

মার্কিন মুলুকে মোহাম্মদ জাফরের জীবনের গল্পটা শুরু হয় ১৯৯১ সালে। তিনি বাংলাদেশ থেকে এসে কুইন্সের জ্যাকসন হাইটসের একটি মেসে থাকতেন গাদাগাদি করে। অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে দেশে বাবা-মায়ের জন্য পাঠাতেন। কিছু টাকা জমিয়ে দেশে গিয়ে বিয়ে করেন। নিউইয়র্কে আসার আগে তার স্ত্রী মাহমুদা খাতুনের গর্ভে আসে প্রথম সন্তান, মাহবুব রবিন। 

মাহতাব শিহাবের জন্ম ২০০০ সালে। এই পরিবারে একটি প্রণোদনামূলক মূল্যবোধ রয়েছে। মাহতাব বলেন, আমরা জানতাম এখানে কতোটা সুযোগ সুবিধা আমরা পাই। এটা আমাদের সৌভাগ্য। এই সুযোগটির শতভাগ সদ্ব্যবহার করতে চাইতাম। এর অংশ হিসেবেই সব সময় চাইতাম ভালো করে পড়াশোনা করতে।

এই পরিবারের শিশুরা প্রথমে ভর্তি হয় ব্রোঙ্কসের পিএস ৯৫ স্কুলে। কিন্তু জাফর নিউইয়র্কের খুবই উঁচুমানের কিন্তু ব্যয়বহুল বেসরকারি স্কুলে সন্তানদের ভর্তি করানোর সুযোগ পেয়ে যান। এটি ছিল একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারের অশ্বেতাঙ্গ শিশুদের জন্য এ সুযোগ। মাহতাব তখন ট্রিনিটি স্কুলে সপ্তম গ্রেডে ভর্তি হয়। 

এই পরিবারে প্রথম বিয়োগান্ত ঘটনাটি ঘটে ২০১৬ সালে। তাদের মা মাহমুদা খাতুন ক্যানসারে মারা যান। তবে জীবনে অনেকটা ছন্দ ফিরে আসে যখন পরের বছর মাহতাব হার্ভার্ডে সুযোগ পান এবং ছোট বোনটি ট্রিনিটি স্কুলের কিন্ডারগার্টেনে যাতায়াত শুরু করে। তাদের বুক তখন গর্বে ভরে গেছে। সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। কিন্তু নেমে এলো আরেক ট্র্যাজেডি!

সপরিবারে মোহাম্মদ জাফর

মার্চে হার্ভার্ড বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মাহতাব বাড়ি চলে আসেন। বাবা মোহাম্মদ জাফর তার আগে থেকেই সেলফ কোয়ারেন্টিনে। ট্যাক্সি চালানোর চাকরিটা ঠিকঠাক আছে কিনা তার খোঁজখবর নিতে মাঝে মধ্যে বের হতেন তিনি। গায়ে সামান্য জ্বর নিয়েও তিনি কয়েকদিন বাইরে গেছেন। কিন্তু একদিন হঠাৎ শুরু হলো শ্বাসকষ্ট। সন্তানরা মিলে তাকে নিয়ে গেল মন্টেফিওর মেডিক্যাল সেন্টারে। এক সপ্তাহ তাকে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়। অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ফেরেননি। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে করোনাভাইরাস তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল!

এই দুঃসংবাদ শোনার পর মাহতাবের বন্ধুরা খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে পরিবারটির দেখভাল করতে শুরু করেছে। স্কুল জীবনের সহপাঠী বন্ধু উইল ক্র্যামার তাদের জন্য গো-ফান্ড-মি ক্যাম্পেইন শুরু করেন। প্রচুর অনুদান আসতে থাকে। কয়েক দিনের মধ্যে আড়াই লাখ ডলার জমা হয়।

মাহতাব বলেন, সেই প্রেপ ফর প্রেপ থেকে ট্রিনিটি ও হার্ভার্ড পর্যন্ত আসতে তিনি বুঝেছেন তারা কতোটা আর্থিক দৈন্য দশার মধ্য দিয়ে গেছেন। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে তার ছোট বোনটির জন্য, যে মাত্র সেকেন্ড গ্রেডে পড়ছে। এই বয়সে বাবা-মাকে হারানোর এই শূন্যতা সে কীভাবে বয়ে বেড়াবে!

তবে বন্ধুবান্ধবদের পাশাপাশি আমেরিকানরা যেভাবে এই এতিমদের প্রতি এগিয়ে এসেছেন তাতে অন্তত অর্থকষ্টে তাদের পড়তে হবে না বলেই আশা করা যায়। এই মহামারীর সময় এমন মানবিকতা, ঔদার্য মানুষের জন্য খুব জরুরি!

সূত্র: সিএনএন