নিউইয়র্কে বেলেভ্যু হসপিটালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. রিচার্ড লেভিটান। কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর নিউমোনিয়া চিকিৎসায় ১০ দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন তিনি। সাধারণ নিউমোনিয়ার সঙ্গে কভিড নিউমোনিয়ার কিছু মৌলিক পার্থক্য খেয়াল করেছেন তিনি। রোগী কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবস্থা গুরুতর হয়ে যাচ্ছে। আর এই পার্থক্যটি না বুঝার কারণে অনেক রোগী হাসপাতালে আসার আগেই মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং তাদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বিষয়টি বিস্তারিত জানা যাক রিচার্ডে বর্ণনায়:
জরুরি চিকিৎসা সেবা নিয়ে আমি ৩০ বছর ধরে কাজ করছি। ১৯৯৪ সালে আমি কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস টিউব সঠিকভাবে প্রবেশ করানোর প্রশিক্ষণ দিতে একটি ইমেজিং সিস্টেম উদ্ভাবন করি। এই উদ্ভাবন থেকে উৎসাহিত হয়েই আমি এ পদ্ধতি বিষয়ে অধিকতর গবেষণায় ব্রত হই। এর ধারাবাহিকতায় আমি চিকিৎসকদের এ বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি দুই দশক ধরে।
মার্চের শেষের দিকে নিউিইয়র্ক শহরের হাসপাতালগুলোতে যখন কভিড-১৯ রোগীর উপচে পড়া ভিড়, আমি তখন বেলেভ্যু হাসপাতালে ১০ দিন স্বেচ্ছাসেবীর কাজ করি। আগে আমি এই হাসপাতালের চিকিৎসকদের ভেন্টিলেটর বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এই কয়দিনে আমি বুঝতে পেরেছি, এই ভাইরাস যে মারাত্মক নিউমোনিয়া সৃষ্টি করছে সেটি আমরা অনেক দেরিতে শনাক্ত করতে পারছি। এটি শুরুর দিকে শনাক্ত করতে পারলে অনেক রোগীকেই ভেন্টিরেটরে নিতে হতো না এবং তারা বেঁচে যেত।
করোনাভাইরাস সৃষ্ট নিউমোনিয়ার কারণে নিউইয়র্কের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের রোগী থাকে। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং গুরুতর আঘাত থেকে শুরু করে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যা যেমন কাটাছেঁড়া, বিষক্রিয়া, হাড় ভাঙা বা মচকে যাওয়া এবং মাইগ্রেনের ব্যথা ইত্যাদি।
কিন্তু বেলেভ্যুর সাম্প্রতিক সময়ে আমি দেখলাম, আগের নিয়মিত রোগী তো রয়েছেই সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কভিড নিউমোনিয়া। আমার প্রথম শিফটের প্রথম ঘণ্টায় দুইজন রোগীর শ্বাসনালীতে টিউব ঢুকাতে হয়েছে।
দেখেছি, কোনো ধরনের শ্বাস-প্রশ্বাস সমস্যা নেই এমন রোগীরও কভিড নিউমোনিয়া রয়েছে। কাঁধে ছুরি বসানো এক রোগীর আমরা এক্স-রে করি কারণ আশঙ্কা ছিল তার ফুসফুস বিকল হয়ে গেছে। কিন্তু দেখা গেল তার কভিড নিউমোনিয়া। পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া রোগীর সিটি স্ক্যান করতে গিয়েও কাকতালীয়ভাবে কভিড নিউমোনিয়া আক্রান্ত শনাক্ত করা হয়েছে। বয়স্ক রোগীদের মধ্যে অজানা কারণে অনেকে মারা গেছেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডায়াবেটিক রোগীর কভিড নিউমোনিয়া দেখা গেছে।
একটা বিষয় দেখে আমরা খুব অবাক হয়েছি: রোগীর কোনো ধরনের শ্বাসকষ্টের লক্ষণ পর্যন্ত নেই, যদিও বুকে এক্স-রে করে মারাত্মক নিউমোনিয়া এবং অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে দেখা গেছে। এটা কী করে সম্ভব?
আমরা কেবল বুঝতে শুরু করেছি, কভিড নিউমোনিয়া প্রাথমিকভাবে অক্সিজেন স্বল্পতার সমস্যা তৈরি করে, আমরা এটিকে বলি সাইলেন্ট হাইপক্সিয়া। সাইলেন্ট বা নীরব বলার কারণ এটি তখনও প্রায় সুপ্ত এবং অনেক গভীরে, এর আচরণ শনাক্ত করা খুব কঠিন।
নিউমোনিয়া হচ্ছে ফুসফুসের এক ধরনের সংক্রমণ। এটি হলে ফুসফুসের বায়ুকুঠুরীগুলো তরল বা পুঁজের মতো থকথকে বস্তুতে পূর্ণ হয়ে যায়। সাধারণত রোগী তখন বুকে অস্বস্তি বোধ করে, শ্বাস নিতে গেলে ব্যথা হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের অন্যান্য সমস্যাও থাকতে পারে। কিন্তু কভিড নিউমোনিয়া যখন কেবল শুরুর দিকে তখন রোগী কিছুই টের পায় না। যদিও অক্সিজেনের মাত্রা অনেক কমে যায়। ক্রমেই অক্সিজেনের মাত্রা মারাত্মকভাবে নেমে যায় এবং মাঝারি থেকে মারাত্মক নিউমোনিয়ার আকার ধারণ করে। বুকে এক্স-রে করলে এটি বুঝা যায়। সুস্থ মানুষের অক্সিজেন সম্পৃক্তির হার সমুদ্রপৃষ্ঠের ৯৪ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ হয়। আর কভিড নিউমোনিয়ার রোগীর ক্ষেত্রে এ মাত্রা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যেতে দেখা গেছে।
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দেখেছি, তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বর, কাশি, পাকস্থলীতে অস্বস্তি এবং দুর্বলতায় ভুগছিলেন। কিন্তু ঘন ঘন শ্বাস নেয়ার সমস্যা তৈরি হওয়ার দিনই তারা হাসপাতালে এসেছেন। প্রকৃতপক্ষে তারা কয়েকদিন আগেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। যখন তারা হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেছেন ততোক্ষণে অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়েছে।
জরুরি বিভাগে আমরা রোগীর শ্বাসনালীতে টিউব ঢুকাই বিভিন্ন কারণে। আমার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বেশিরভাগ রোগী গুরুতর কোনো শক পেলে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন এবং গোঙাতে থাকেন। তাদের ইনটিউবেশন দিতে হয়। আবার অচেতন থাকলে বা শ্বাস নিতে শরীরের সব পেশীতে টান পড়ে এমন অবস্থা হলেও ইনটিউবেশন লাগে। এটা একটা চরম পরিস্থিতি। কভিড নিউমোনিয়ার রোগীরা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা।
আমার দেখা বেশিরভাগ কভিড নিউমোনিয়া রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল মারাত্মক কম হওয়ার পরও তাদের অবলীলায় সেলফোন ব্যবহার করতে দেখেছি। অথচ মনিটরে তখন দেখাচ্ছে তাদের অক্সিজেনের মাত্রা বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে কম। এসব রোগী ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে থাকেন, কিন্তু তাদের মধ্যে খুব একটা যন্ত্রণা বা পীড়ার লক্ষণ দেখা যায় না, অথচ অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকরকম কম এবং বুকের এক্স-রে রিপোর্টে মারাত্মক নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে।
আমরা এ বিষয়টির পেছনের কারণ কেবল বুঝতে শুরু করেছি। করোনাভাইরাস ফুসফুসের কোষগুলোকে আক্রমণ করে এতে কোষের পৃষ্ঠটান কমে যায়। এই কোষগুলো ফুসফুসের বায়ুকুঠুরিগুলোকে শ্বাস নেয়ার সময় উন্মুক্ত রাখতে সহায়তা করে এবং ফুসফুসের স্বাভাবিক কাযক্রম চালু রাখতে এটি খুবই জরুরি। কভিড নিউমোনিয়ার কারণে যখন প্রদাহ শুরু হয় তখন বায়ুকুঠুরিগুলো চুপসে যায় এবং অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকে। প্রদাহের শুরুর দিকে কিন্তু ফুসফুস স্বাভাবিক কাজ করে কারণ তখনও অনমনীয় বা তরলে ভরে ওঠে না। এর অর্থ রোগী তখনো কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করতে পারে। যেহেতু কার্বন ডাই অক্সাইড জমছে না এ কারণেই রোগী ঘন ঘন শ্বাস নেয়ার মতো সমস্যা অনুভব করে না।
ফুসফুস যেহেতু অক্সিজেন শোষণ করতে পারছে না এ কারণে রক্তের অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে ঘন ঘন ও গভীর শ্বাস নিতে শুরু করে। আর এটি ঘটতে পারে রোগীর অজান্তেই। এটিই হলো সাইলেন্ট হাইপক্সিয়া। এর প্রতিক্রিয়ায় ফুসফুসের প্রদাহ আরো বাড়ে এবং আরো বেশি বায়ুকুঠুরি চুপসে যেতে থাকে। অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত নামতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে নিউমোনিয়া বাড়তে থাকে। সবচেয়ে বিপদের কথা হলো, দ্রুত ও গভীর শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করার কারণে ফুসফুস আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কভিড নিউমোনিয়ার ২০ শতাংশ রোগী ফুসফুস জখমের দ্বিতীয় ও মারাত্মক ধাপে চলে যায়। তরল বাড়তে থাকে এবং ফুসফুস এক সময় শক্ত হয়ে যায়। কার্বন ডাই অক্সাইড বাড়তে থাকে এবং রোগীর শ্বাস নেয়ার ক্ষমতাই শেষ হয়ে যায়।
এই সময়টাতে রোগীর শ্বাস নিতে অত্যন্ত কষ্ট হয় এবং অনেকের অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকরকম কমে যায়। তখন তাকে ভেন্টিলেটরে নিতে হতে পারে।
সাইলেন্ট হাইপক্সিয়া দ্রুত মারাত্মক রূপ নেয় এবং রেসপিরেটরি ফেইলর পর্যন্ত গড়ায়। ঘন ঘন শ্বাস নেয়ার সমস্যা দেখা দেয়া ছাড়াই কোনো কভিড-১৯ রোগীর আকস্মিক মৃত্যুর এটি একটি ব্যাখ্যা হতে পারে। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ কভিড-১৯ এর অনেক রোগীরই মৃদু উপসর্গ দেখা দেয় এবং তারা ঘরে থাকে। টানা এক বা দুই সপ্তাহ তাদের কোনো চিকিৎসাই হয় না। এ ধরনের রোগী হাসপাতালে আসার পর দ্রুত গুরুতর অবস্থায় চলে যায়।
এই মহামারী আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করার বড় কারণ হলো বেশিরভাগ রোগী জরুরি বিভাগে আসছেন ফুসফুসের মারাত্মক সমস্যা নিয়ে। এই রোগের কারণে বেশিরভাগ মৃত্যুই ঘটছে ফুসফুসের সমস্যায়। আর এর কারণ হলো বেশিরভাগ রোগী গুরুতর নিউমোনিয়ার লক্ষণ প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে যাচ্ছেন না। অনেককেই ভেন্টিলেটরে নিতে হচ্ছে। এ মেশিনের সঙ্কট দেখা দেয়ার এটিও একটি কারণ। আর যাদের ভেন্টিলেটরে নিতে হচ্ছে তাদের অনেকেই মারা যাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি এড়াতে রোগীর কভিড নিউমোনিয়া একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার উপায় বের করতে হবে। হাসপাতাল বা ডাক্তারের অফিসে গিয়ে করোনাভাইরাস টেস্ট করার আগে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে হাইপক্সিয়া টেস্ট করতে হবে। আর এটি বাসাতে নিজেই করা যায়। কোনো ধরনের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ফার্মেসিতে কিনতে পাওয়া এমন একটি সাধারণ ডিভাইস দিয়ে এটি করা যায়। এক্ষেত্রে সহজলভ্য ও সহজ একটি ডিভাইস হলো পালস অক্সিমিটার। এটির ব্যবহার থার্মোমিটারের চেয়ে জটিল নয়। একটি বাটন চেপে আঙ্গুলের মাথায় ধরলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এটি অক্সিজেন প্রাপ্তির সমস্যা এবং হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধির তথ্য দেখাবে। রোগীরা এটি করতে পারলে জরুরি বিভাগে চাপ কমবে। আর চিকিৎসকরাও তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
তবে ক্ষেত্রে কিছু ভুল বুঝাবুঝির আশঙ্কা আছে। যাদের আগে থেকেই ফুসফুসের সমস্যা রয়েছে বা অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে সামান্য কম দেখানো কভিড-১৯ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না-ও হতে পারে। এ কারণে এমন সন্দেহ হলে চিকিৎসকের সঙ্গে অবশ্যই পরামর্শ করতে হবে।
রিচার্ড লেভিটান, যুক্তরাষ্ট্রের লিটলটনে জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার একজন ইমার্জেন্সি ফিজিশিয়ান, এবং এয়ারওয়ে ক্যাম টেকনোলজিসের প্রেসিডেন্ট।
নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে










