বর্তমান যুগে যখন পৃথিবীর নানা পেশায় নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে, তখন বিমানচালনার মতো প্রযুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বপূর্ণ পেশায় নারীর সংখ্যা এখনও হতাশাজনকভাবে কম। যুক্তরাজ্যের বিমান সংস্থাগুলোর মাত্র ৬ দশামিক ৫ শতাংশ পাইলট নারী। ক্যাপ্টেনদের মধ্যে এই সংখ্যা আরো কম। অথচ গত এক দশকে নারী পাইলট বাড়ানোর লক্ষ্যে একাধিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবুও কেন এই পেশায় নারীদের প্রবেশ এখনো এত সীমিত—এ প্রশ্ন এখনো প্রাসিঙ্গক।
৬১ বছর বয়সী অভিজ্ঞ পাইলট মারিয়া পারনিয়া ডিগিংস প্রায় ১৬ হাজার ঘণ্টা উড়োজাহাজ চালিয়েছেন। তিনি বলেন— এখনো অনেক যাত্রী অবাক হয়ে বলেন— ওহ! আপনি একজন নারী? কেউ আবার তার পার্কিং করা নিয়ে প্রশংসা করেন, যেন নারী হিসেবে তার এ দক্ষতা অপ্রত্যাশিত। এসব মন্তব্যে মিশ্র অনুভূতি হয় তার। একদিকে প্রশংসা, অন্যদিকে সুপ্ত লিঙ্গবৈষম্যের আভাস।
নারী পাইলটদের ক্ষেত্রে এমন আচরণ যে শুধুই সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ তা নয়। নারী পাইলটের পোশাক ও আচরণেও এক ধরনের সামাজিক প্রত্যাশা কাজ করে। তবে পারনিয়া ডিগিংস বলেন, ‘আমি আলাদা কেউ হতে চাই না। পেশাদার হিসেবে বিবেচিত হওয়াই যথেষ্ট।’
গার্ডিয়ানের খবর বলছে, এ খাতে নারীদের ক্ষেত্রে বেতনবৈষম্য পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। যুক্তরাজ্যের এয়ারলাইনে পুরুষ পাইলট ও ইঞ্জিনিয়াররা উচ্চ বেতনের তালিকায় থাকলেও, অধিকাংশ নারী কর্মী কাজ করছেন কেবিন ক্রু হিসেবে, যারা অনেক কম বেতন পান। ইজি জেটে পুরুষের প্রতি ১ পাউন্ড আয়ের বিপরীতে নারীরা আয় করছেন মাত্র ৫৩ পেনি। পুরুষদের তুলনায় নারীদের গড় বোনাসও প্রায় ২৮ শতাংশ কম।
কেবল যুক্তরাজ্য নয়, এই বৈষম্য আন্তর্জাতিক পরিসরেও দৃশ্যমান। যেমন, রায়ানএয়ারে জেন্ডার পে গ্যাপ ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশ, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে ২৭ শতাংশ এবং ভার্জিন আটলান্টিকে ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এই পার্থক্যের পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, ব্যবস্থাপনাগত কাঠামো, আউটসোর্সিং বা সহায়ক সংস্থাগুলোর ভূমিকাকে। তবে মৌলিক বৈষম্যকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ইজি জেটে নারী পাইলটদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে সামান্য বেশি। তবে প্রশিক্ষণরত পাইলটদের মধ্যে ১৩ শতাংশ নারী হওয়া সত্ত্বেও এটি খুব বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। ইজি জেটের ফার্স্ট অফিসার ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপক হান্না ওয়েলস মনে করেন, স্কুল পর্যায় থেকেই এই পেশা নারীদের কাছে পরিচিত ও আকর্ষণীয় করে তোলা দরকার। অনেক নারী এখনও মনে করেন, এটি তাদের জন্য নয়।
চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনেও পাইলট মানেই পুরুষ, আর কেবিন ক্রু মানেই নারী—এই চিত্রই বারবার উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে ছোটবেলা থেকেই ছেলেমেয়েদের মধ্যে পেশাজীবী পরিচয়ের একরকম লিঙ্গভিত্তিক ছাঁচ গড়ে ওঠে। ইজি জেটের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা পাইলট চরিত্রে পুরুষের নাম বেছে নেয় এবং সেই অনুযায়ী কণ্ঠস্বরও ব্যবহার করে।
এছাড়া পাইলট প্রশিক্ষণ খরচ প্রায় ১ লাখ পাউন্ড বা তার বেশি, যা আত্মনির্ভরশীল অনেক নারীর জন্য এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যাদের ভবিষ্যতে মাতৃত্বজনিত কর্মবিরতির কথা বিবেচনা করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে এক গবেষণায় দেখা গেছে, পাইলটদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে যাত্রী ও সহকর্মীরা শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের তুলনামূলকভাবে বেশি নম্বর দেন। একই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, নারীরা প্রায়ই মনে করেন, তাদের অর্জনগুলোকে কোটা বা নারী বলে সুযোগ পাওয়া হিসেবে বিবেচিত হয়।
এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নারী পাইলটরা যখন আকাশে পাখির মতো ডানা মেলেন, তখন তারা কেবল পেশাজীবী নন, এক একটি অনুপ্রেরণার নামও হয়ে ওঠেন। মারিয়া পারনিয়া ডিগিংস বলেন, ‘বিমান জানে না পাইলট পুরুষ না নারী। আকাশে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখা, মেঘের ছায়া আর পৃথিবীর রূপ—এসবের চেয়ে সুন্দর অফিস আর কোথায়?’
নারীর দক্ষতা এবং সম্ভাবনাকে সমান সুযোগ দিয়ে যদি আকাশের নিয়ন্ত্রণেও পুরুষ-নারীর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে হয়তো এই পেশাও একদিন লিঙ্গ নিরপেক্ষ হয়ে উঠবে।










