করোনাভাইরাসে সংক্রমণ বিস্তার ঠেকাতে দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। লকডাউন সময়সীমা এক দফা বাড়ানোও হয়েছে। করোনার স্বল্প ও প্রাথমিক লক্ষণযুক্তদের বাড়িতে থাকতে পরামর্শ দিয়ে নির্দেশিকা জারি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

কিন্তু দেশটির পরিসংখ্যানই বলছে, এদেশের অধিকাংশ মানুষের পক্ষে হোম কোয়ারেন্টিন পালন করা অসম্ভব। কারণ, ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, একটি বা দু’টি মাত্র ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয় এমন বাসিন্দা ৮২ কোটিরও বেশি! 

আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, ভারতে হাউজহোল্ড সাইজ বা পরিবারের আকার গড়ে ৪ দশমিক ৮৫। অর্থাৎ একই ঠিকানায় প্রায় পাঁচ জন মানুষ বসবাস করে। আর মাত্র ৫ শতাংশ ভারতীয় বাড়ির পাঁচ বা তার বেশি কক্ষ আছে। অর্থাৎ অধিকাংশ ভারতীয়কে একটি ঘর পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে ব্যবহার করতে হয়। 

বিশাল অংকের ভারতীয় বসতবাড়ির একটিমাত্র ঘর রয়েছে। এর পরেই আছে দুই ঘরের বাড়ি। এই দুই ধরনের বসতবাড়ি ভারতের মোট বসতবাড়ির ৬৯ শতাংশ বা ১৭ কোটি হাউজহোল্ড। ‘হাউসহোল্ড’ শব্দটি আগে আদমশুমারিতে পরিবার হিসেবে উল্লিখিত করা হলেও পরবর্তীতে ‘এক ঠিকানায় বসবাসকারী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

এর অর্থ হলো অধিকাংশ ভারতীয়র পক্ষে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা কোনো সদস্যের জন্য আলাদা একটি কক্ষ ছেড়ে দেয়া সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, প্রায় এক কোটি পরিবারের শোবার জন্য আলাদা কোনো ঘরই নেই। কারণ সে ঘর দোকান বা অফিসের জন্য ব্যবহৃত হয়। সেখানেই তারা রাতে ঘুমান। তাছাড়া অধিকাংশ পরিবারের একটিমাত্র টয়লেট অথবা টয়লেটই নেই।

জনসংখ্যাবিদরা বলছেন, শুধু বস্তিই নয়, মুম্বাই, দিল্লি, কলকাতার মতো শহরে এমন আরো অনেক জায়গা আছে যেখানে একটিমাত্র ঘরে কমপক্ষে চার-পাঁচ জন থাকেন। যেখানে দেশে বসতবাড়ির সংখ্যা সাড়ে ২৪ কোটি। আর ‘হাউসহোল্ড’-এর সংখ্যা ২৪ কোটি ৭২ লাখের মতো। 

অপরদিকে মাত্র প্রায় ৪ কোটি বসতবাড়ির সদস্যপ্রতি কমপক্ষে একটি করে কক্ষ আছে। মোট বসতবাড়ির তুলনায় এই অনুপাতটা মাত্র ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এই অনুপাতটাও দিন দিন কমছে কারণ পরিবারের (হাউজহোল্ড) আকার বাড়ছে। আর যারা ব্যাচেলর বা পরিবার নিয়ে মেসে থাকেন তাদের অবস্থা আরো করুণ!

বসতঘরের সঙ্গে হাউজহোল্ড সাইজের তুলনামূলক ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশিরভাগ হাউজহোল্ডেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বাস্তবিক অর্থে অসম্ভব। ৪ শতাংশেরও কম ভারতীয় হাউজহোল্ডের সদস্য সংখ্যা একজন। এই ক্যাটাগরির মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি হাউজহোল্ডে সেলফ কোয়ারেন্টিন সম্ভব। আর দুই সদস্যের হাউজহোল্ডে ৫৬ শতাংশের মধ্যে একজনের একটা কক্ষ বরাদ্দ থাকে না।

চেন্নাই থেকে ফেরা সাত জন শ্রমিকের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি গ্রামে আম ও বটগাছে কোয়ারেন্টিনে থাকার একটি ভিডিও সম্প্রতি ইউটিউবে ভাইরাস হয়

অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নমূলক গবেষণার উৎকর্ষকেন্দ্র ‘ইনস্টিটিউট অব ইকনমিক গ্রোথ’ (আইইজি)-এর নাবার্ড চেয়ার প্রফেসর সৌদামিনী দাস বলেন, এটা ঠিক যে এ দেশে বাড়িতে আইসোলেশনের পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এই নিয়ম সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্যের কথা বলেনি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আক্রান্তদের যাতে ঠিক চিকিৎসা দেয়া যায়, তার জন্য বলা হয়েছে।

সরকারের এমন ঘোষণা ছাড়া আর উপায়ও ছিল না বলে মনে করছেন অনেকে। আইইজির ‘ইন্ডিয়ান ইকনমিক সার্ভিস সেকশন’-এর কোর্স ডিরেক্টর ও প্রধান প্রভাকর সাহুর মতে, দেশের সেই স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নেই যে, সামান্য উপসর্গ দেখা দিলে তাদের চিকিৎসা করা যাবে। এ ক্ষেত্রে যাদের সত্যি প্রয়োজন, তাদেরই হাসপাতালে বা কোয়রান্টিন কেন্দ্রে আনা হোক। বাকিদের বাড়িতে সমস্ত নিয়ম মেনে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে থাকতে হবে।

ইন্ডিয়ান ভাইরোলজিক্যাল সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল, বিজ্ঞানী যশপাল সিংহ মালিক বলেন, বেশিরভাগেরই হাসপাতাল বা কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রে আসার ক্ষেত্রে অনীহা রয়েছে। সে কারণে তারা রোগ গোপন করে যান। এখন স্বল্প বা প্রাথমিক উপসর্গ হলে বাড়িতে থেকে যদি সুস্থ হয়ে যান, তা হলে সেটা ভালোই। সবার পক্ষে শয্যার ব্যবস্থা করা সত্যিই অসম্ভব।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, আনন্দবাজার পত্রিকা