পশ্চিম আয়ারল্যান্ডের ডানেগলের উপকূল থেকে আটলান্টিক মহাসাগরে ছড়িয়ে থাকা দ্বীপ ওয়েই। দ্বীপটিতে এসে যেন থমকে গেছে মহাকাল, স্তব্ধ হয়ে আছে সময়। ছোট্ট এই দ্বীপে নেই কোনো গাড়ি। শেষবার এই দ্বীপে কেউ স্থায়ীভাবে বসবাস করেছিল সত্তরের দশকে। এরপর সম্প্রতি আবার কিছু মানুষ গিয়ে প্রাণ ফিরিয়ে দিচ্ছেন এই পরিত্যক্ত দ্বীপের। নতুন করে আবার তারা গড়ে তুলছেন হারিয়ে যাওয়া এক সভ্যতা, যেখানে আগ্রহী পর্যটকরাও খুঁজে পাচ্ছেন প্রকৃতির নির্জনতার অভিজ্ঞতা।

সপ্তাহের একদিন—শুক্রবার রাতে দ্বীপটিতে ফিরে পাওয়া যায় পুরনো দিনের আয়ারল্যান্ডের স্মৃতি । যেখানে আকাশে জ্বলে ওঠে ধূপকাঠির ধোঁয়া, ঘরে ঘরে জ্বলে প্রাচীন পিদিম। সদ্য ধরা মাছ ভাগাভাগি করে নেয়া হয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে। দ্বীপজুড়ে ঘুরে বেড়ায় কুকুর আর মুরগির ঝাঁক। সমুদ্রের গর্জন আর সমুদ্রপাড়ের গুল্মের শিরশির শব্দ যখন স্থানীয়দের ব্যস্ততার ভাষায় মিশে যায়, তখন বিশ্বাস করা কঠিন হয় যে কয়েক দশক ধরে এই দ্বীপ প্রায় জনশূন্য ছিল।

প্রায় ১৫ মিনিটের নৌকা যাত্রায় ডানেগলের ক্রুইট দ্বীপ থেকে পৌঁছানো যায় ওয়েই দ্বীপে। তবে সেখানে পৌঁছানোর জন্য কোনো নিয়মিত ফেরি সার্ভিস নেই, কায়াক বা ব্যক্তিগত নৌকাই ভরসা। বিদ্যুৎ বা চলমান পানির ব্যবস্থা না থাকায় দূর থেকে মূল ভূখণ্ডের ঝলমলে আলো যেন মনে করিয়ে দেয় আধুনিক সভ্যতা থেকে দূরে থাকার মাহাত্ম্য।

১৯৭৭ সালে শেষ স্থায়ী বাসিন্দার প্রস্থানের পর প্রায় ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে দ্বীপটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। এক সময় এখানে প্রায় একশ জনের মতো মানুষ থাকতেন, ছিল প্রায় ত্রিশটি পরিবার। আধুনিক জীবনযাত্রার টানে একে একে সবাই মূল ভূখণ্ডে চলে যান।

শূন্য দশকে পল কাউয়ান ও তার ভাইয়েরা ছেলেবেলার স্মৃতি আঁকড়ে আবার দ্বীপে ফিরতে থাকেন। সত্তরের দশকে তাদের পরিবার বেলফাস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বাঁচতে দ্বীপটিতে বসবাস শুরু করে। পরে যখন আবার তারা বেলফাস্টে ফিরে যান, তখনও ওয়েই দ্বীপের স্মৃতি ভুলতে পারেননি তারা। এক পর্যায়ে নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে আবার দ্বীপে ফেরেন তারা, জীর্ণ পুরোনো বাড়ি সংস্কার করেন, নতুন করে বানান ঘর। পরে তাদের অনুসরণ করে অন্যান্য প্রাক্তন বাসিন্দারাও ফিরে এসে শুরু করেন দ্বীপ পুনরুদ্ধারের এক অনন্য প্রচেষ্টা।

দ্বীপটিতে প্রতি বছরই কিছু কিছু বাসিন্দা ফিরে আসছেন। কষ্ট করে নৌকায় করে আনতে হয় নির্মাণসামগ্রী, তবুও দাঁড়িয়ে গেছে প্রায় ২০টি বাড়ি। দ্বীপে রয়েছে একটি ছোট হোস্টেল, যেখানে ছয়জন পর্যন্ত থাকতে পারেন, সঙ্গে একটি বুনো ক্যাম্পিং স্পটও রয়েছে। তবে কোনো দোকান বা বাজার নেই।

ওয়েই দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও উল্লেখ করার মতো। আটলান্টিকের ফেনিল ঢেউ ছুঁয়ে উঠে এসেছে খাড়া পাহাড়, যেগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পর্বতারোহীদের টানে চুম্বকের মতো। কায়াকিং, হাইকিং আর সমুদ্রের পানিতে সাঁতারের জন্য দ্বীপটি হয়ে উঠছে পর্যটকদের অনন্য পছন্দের জায়গা।

দ্বীপে বিদ্যুৎ নেই, তবে সৌরবিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখা ট্যাংকই পানির মূল উৎস। ফলত এখানে, ভোগের ধারায় নয় জীবনযাত্রা গতি চলে সংযম ও প্রকৃতির ছন্দে।

দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত কিছুটা উর্বর ও সবুজ, যেখানে ছোট একটি জেটি রয়েছে। সেখান থেকেই পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় দ্বীপের লোকালয়ে। যেখানে ঝরঝরে পাহাড় ঘেরা দীর্ঘ সরু জলধারার দুপাশে ছড়িয়ে আছে ঘরবাড়ি। আর উত্তর প্রান্ত সম্পূর্ণ রুক্ষ, ধূসর পাথরে মোড়া, যেখানে উঁচু সাগরগুহা আর সাগরস্তম্ভ ভেঙে পড়ে উত্তাল ঢেউয়ে।

কিছু সাহসী পর্যটক খুঁজে পান দ্বীপের পেছনে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত সুন্দর লেক—যেখানে একসময় স্থানীয়রা গোসল করতেন। ঝলমলে পাথর বেয়ে যখন তারা নামেন সেই লেকের পাড়ে, সাগরের দিকটাও স্পষ্ট দেখা যায়। সেখানে ডুব দেয়া এক গা ছমছম করা অভিজ্ঞতা—একটি দ্বীপের চূড়ায়, পাহাড় আর সমুদ্রের মাঝখানে এক ফ্রেশওয়াটার লেকে সাঁতার কাটা।

মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললে, আধুনিক জীবনযাপনের বাইরে গিয়েও শান্তিপূর্ণ, গভীরভাবে অর্থবহ এক জীবন গড়ে তোলা সম্ভব, ওয়েই দ্বীপ যেন এর জীবন্ত উদাহরণ।