সন্তান জীবনের গভীর অর্থ বয়ে আনে—অনেকেই বাবা-মা হওয়ার আগে থেকেই এটা অনুভব করেন। তবে সন্তানের কারণে জীবন গভীর অর্থবোধক হলেও, ব্যক্তিগত সুখ বা সন্তুষ্টি কিছুটা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে মায়েদের ক্ষেত্রে এমনটি বেশি ঘটে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা সেই অনুভূতির-ই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দিয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত অভিভাবকদের মানসিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও, সন্তান থাকা মানুষদের কাছে নিজেদের জীবন আরো অর্থপূর্ণ মনে হয়।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অভিভাবকদের জীবনমান, মানসিক স্বস্তি এবং সন্তানের উপস্থিতির পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যেসব মানুষ সন্তানহীন তারা জীবনের প্রতি বেশি সন্তুষ্ট। আর যাদের সন্তান আছে তারা জীবনের অর্থ বেশি খুঁজে পান। অর্থাৎ, সন্তানের উপস্থিতি জীবনকে মানে বাড়ায়, কিন্তু সুখের অনুভূতি সবসময় বাড়ায় না।

সন্তান মানুষ করা কোনো একক কাজ নয়। সমাজতত্ত্ববিদ মারিটা জ্যাকব বলেন,সন্তান মানে এমন কিছু নয় যা আপনি একা সামলাতে পারবেন। ছোট শিশুর ক্ষেত্রে অল্প সময়ের তারতম্যই পুরো দিনের মানসিক অবস্থা বদলে দিতে পারে। তাই তিনি মনে করেন, অভিভাবকদের একে অপরকে সাহায্য করা উচিত এবং সেই সাহায্য গ্রহণ করাও জরুরি। তার সন্তানরা যখন ছোট ছিল, তখন তিনি অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে মিলিতভাবে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিলেন। ‘আমরা প্রতিদিন একসঙ্গে কয়েকজন শিশুকে কিন্ডারগার্টেন থেকে নিয়ে আসতাম।’

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, সন্তান তাদের জীবনে একধরনের উদ্দেশ্য ও দায়িত্ববোধ এনে দেয়। তবে একইসঙ্গে আসে ক্লান্তি, উদ্বেগ এবং সময়ের সীমাবদ্ধতা। বিশেষ করে মায়েরা সন্তান পালনের দায়িত্বে বেশি সময় ব্যয় করেন, যার ফলে তাদের ব্যক্তিগত সময়, পেশাগত অগ্রগতি এবং মানসিক প্রশান্তি প্রভাবিত হয়।

তবে এ চিত্র সব দেশে একরকম নয়—কিছু দেশে অভিভাবকত্বের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক। বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের কিছু দেশে অভিভাবকত্বের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক। এর পেছনে রয়েছে উন্নত সামাজিক নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, এবং শিশুসেবা ব্যবস্থার সহজলভ্যতা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইউরোপে সন্তান থাকা অভিভাবকদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা জীবনের গভীর অর্থ খুঁজে পান। কিন্তু একইসঙ্গে ৪৮ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, তাদের জীবনসন্তুষ্টি অনেক কমে গিয়েছে। আর, মায়েদের ক্ষেত্রে এই অসন্তুষ্টির হার পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

গবেষকরা বলছেন, অভিভাবকত্বের অভিজ্ঞতা একদিকে যেমন জীবনের গভীরতা বাড়ায়, অন্যদিকে এটি মানসিক চাপও তৈরি করে। তাই পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উচিত অভিভাবকদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। যার মাধ্যমে তারা জীবনের অর্থ ও সুখ—দুটোই খুঁজে পান।

ডয়চে ভেলে’তে প্রকাশিত জুলিয়া ভারজিনের লেখা থেকে সংক্ষেপিত।