বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে এই মহামারীর মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তহবিল দেয়া স্থগিত করার ঘোষণা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অবশ্য গত মঙ্গলবার এ ঘোষণা দেয়ার আগে থেকেই তিনি এ নিয়ে হুমকিধমকি দিয়ে আসছেন। গত সপ্তাহেই তিনি অভিযোগ করেছিলেন, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তার রোধে এ সংস্থার অব্যবস্থাপনা দায়ী। গত বছরের ডিসেম্বরে যখন চীনে প্রথম এ ভাইরাস শনাক্ত করা হয় তখনই দ্রুততার সঙ্গে তারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখেনি।
জাতিসংঘের মহাসচিক আন্তোনিও গুতেরেস মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ মহামারীকে অভূতপূর্ব বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা যখন চূড়ান্তভাবে মহামারী পরিস্থিতির মধ্যে নিপতিত হয়েছি তখন বিষয়টি নিখুঁতভাবে বুঝতে হলে আমাদের পেছনের দিকেও তাকাতে হবে। কীভাবে এমন একটি রোগ শুরু হলো এবং দ্রুত ছড়িয়ে মহাবিপর্যয় ডেকে আনলো এবং সংশ্লিষ্টরা কীভাবে এ সংকটের বিষয়ে সাড়া দিয়েছে সেটিও দেখার বিষয়। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা অন্যান্য মানবিক সেবা সংগঠন যারা এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে তাদের সামর্থ্য ও রসদ কমিয়ে দেয়ার সময় এটি নয়। এ মহামারী মোকাবেলায় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থা মূলত জাতিসংঘেরই একটি অঙ্গ। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নীতি বিশেষ করে সংক্রামক রোগের বিষয়ে নীতি প্রণয়নে সহযোগিতা করাই এ সংস্থার উদ্দেশ্য।
এ সংস্থার সদস্য দেশ ১৯৪টি। ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে প্রতিটি সদস্য দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত প্রতিনিধি দল থাকেন। সংস্থার সিদ্ধান্ত ও নীতি প্রণয়ন হয় এ অ্যাসেম্বলিতে। এই সদস্যদেশগুলো সরাসরি এ সংস্থার নেতা নির্ধারণ এবং পরিচালনায় যুক্ত থাকেন। অ্যাসেম্বলি থেকেই মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়। এখান থেকে এজেন্ডা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বাজেট প্রণয়ন, পর্যালোচনা ও অনুমোদনসহ নীতি র্নিধারণী বিভিন্ন কাজ হয় এখান থেকেই।
গত ৭০ বছরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সফলতার মুকুটে যুক্ত হয়েছে অনেকগুলো পালক। গুটিবসন্ত নির্মূল, পোলিও প্রাদুর্ভাব ৯৯ শতাংশ কমিয়ে আনা এবং আফ্রিকায় ইবোলা যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে এ সংস্থা। সর্বসাম্প্রতিককালে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, আর্থিক সহায়তা ও দক্ষ কর্মী দিয়ে সহযোগিতা করেছে তারা।
অবশ্য আমলাতন্ত্র, রাজনীতিকরণ এবং হাতেগোনা কজন বড় অর্থদাতার নিয়ন্ত্রণে নিজেকে সঁপে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে জাতিসংঘের এ সংস্থার বিরুদ্ধে।
এ সংস্থার তহবিল আসে বিভিন্ন উৎস থেকে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তিগত দান, সদস্য দেশগুলোর চাঁদা এবং মূল সংগঠন জাতিসংঘের অনুদান অন্যতম।
এ সংগঠনের সদস্যপদ রাখতে হলে প্রতিটি সদস্য দেশকে চাঁদা দিতে হয়। এটিকে বলা হয় ‘অ্যাসেসড কন্ট্রিবিউশন’। চাঁদা নির্ধারণ করা হয় মূলত সেই দেশের সম্পদ ও জনসংখ্যার অনুপাতে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মোট তহবিলের মাত্র এক চতুর্থাংশ আসে এ চাঁদা থেকে। বাকি তিন চতুর্থাংশ আসে স্বেচ্ছা অনুদান থেকে। সেটি হতে পারে সদস্য দেশ বা অন্য অংশীদারদের কাছ থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় দাতা। দুই বছরের তহবিল সাইকেলের মধ্যে ২০১৮-১৯ সালে এ দেশ দিয়েছে ৮৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এর মধ্যে সদস্য চাঁদা হিসেবে ২৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার এবং অনুদান হিসেবে ৬৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সারা বিশ্ব থেকে সংস্থার জন্য যে স্বেচ্ছা অনুদান আসে তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
দ্বিতীয় বৃহত্তম দাতা বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। মার্কিন সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস ও তার স্ত্রী মেলিন্ডার প্রতিষ্ঠিত দাতব্য সংস্থা এটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তৃতীয় বৃহত্তম দাতা যুক্তরাজ্য। তারা দিয়েছে ৪৩ কোটি ৪৮ রাখ ডলার। এরপরই আছে যথাক্রমে জার্মানি ও জাপান।
একই সময়ে চীন দিয়েছে মোট ৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ফলে বেশি চাঁদা ও তহবিল দেয়ার কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠতা দেখাচ্ছে এবং তাদের পক্ষে কাজ করছে এমন অভিযোগ সঠিক নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য চাঁদা নাকি স্বেচ্ছা অনুদান থেকে তহবিল স্থগিত করবে সেটি কিন্তু এখনো পরিষ্কার নয়।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
সমালোচকরা বহুদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, বিভিন্ন সদস্য দেশ তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভিত্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দাতারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত। এমন ধারণা থেকে ইতিহাসে বারবার উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন তার মিত্রদের নিয়ে কয়েক বছরের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ত্যাগ করে। তাদের অভিযোগ ছিল, যুক্তরাষ্ট্র এ সংস্থার ঘাড়ে চড়ে বসেছে।
সম্প্রতি চীনের সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্পর্ক নিয়েও এমন সন্দেহ সংশয়ের কথা শোনা যাচ্ছে। চীনের সম্পদ ও ক্ষমতার অব্যাহত বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কতোটা স্বাধীন। করোনাভাইরাস মহামারীতে চীনের বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করায় এমন সন্দেহ আরো তীব্র হচ্ছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন তাইওয়ানের সদস্যপদ প্রাপ্তি সফলভাবে ঠেকিয়ে দিতে পেরেছে। এ নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করা হলে বারবার এড়িয়ে যাচ্ছেন।
তাইওয়ানের নিজস্ব সরকার ব্যবস্থা থাকলেও বেইজিং এটিকে ঐতিহাসিক অংশ বলে দাবি করে আসছে।
গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তা প্রশাসন এই মহামারীতে সবক্ষেত্রে চীনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, মাঠ পর্যায়ের অবস্থা সঠিকভাবে বুঝার লক্ষ্যে চীনে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পাঠানোর ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কি কিছু করেছে? চীনা কর্তৃপক্ষেন স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে তারা কিছু কি বলেছেন। তারা তাদের কাজটা ঠিকমতো করলে প্রাণহানি ন্যূনতম রেখে ভাইরাসের উৎসেই এ প্রাদুর্ভাবকে সীমিত রাখা যেত।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পেও আরো কঠোর কথা বলেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, এ বিপর্যয়কে মহামারী ঘোষণা করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক সময় নিয়েছে কারণ চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সেটি চায়নি।
এসব অভিযোগের জবাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই মহামারীকে রাজনীতিকরণ করা থেকে বিরত থাকতে সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এই ভয়ঙ্কর শত্রুর মোকাবেলা করতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের একসঙ্গে কাজ করা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রস আধানম গেব্রিয়েসুস।
সূত্র: সিএনএন










