ধরুন, দুপুরের খাবার সেরে আলসেমি মাখা চোখে অফিস বিল্ডিংয়ের জানালা দিয়ে একটু বাইরে তাকালেন। কাজের ফাঁকে একটু বিরতি দিয়ে হয়তো শক্তিসঞ্চয়ের চেষ্টাও হতে পারে এটি। কিন্তু দেখলেন, আরাম তো দূরের কথা, উল্টো শুরু হয়ে গেল মাথাব্যথা! এটি কিন্তু কাকতালীয় ব্যাপার নয়- বিজ্ঞানীরা বলছেন, নগরের বিশাল অট্টালিকার দিকে তাকালে মাথাব্যথা এমনকি মৃগী রোগের মতো খিঁচুনিও হতে পারে!

শহরের বড় বড় দালানগুলো যেমন হয়- একটি ভবন যেন কংক্রিটের একটি ধূসর রাস্তা, যার মাঝখানে অনেকগুলো সরলরেখা। সেই সঙ্গে জানালাগুলো কঠিন ইটের দেয়ালে তৈরি করে নিয়মিত স্ফটিক বিরতি। যতোদূর চোখ যায় নিরবচ্ছিন্ন সরলরেখা, আপনার চোখকে প্রশান্তি দেয়ার মতো কোনো বিরতি বা বৈচিত্র্য নেই। এই বৈশিষ্ট্যই মারাত্মক সমস্যা তৈরি করে। এ কারণেই নগরের দৃশ্য দর্শন আপনাকে প্রশান্তির বদলে দিতে পারে অসহ্য মাথাব্যথা।

কমপক্ষে ১০ হাজার বছরের বিবর্তনে মানুষের মস্তিষ্ক প্রকৃতির নানা দৃশ্য খুব নিখুঁতভাবে প্রক্রিয়া করার দক্ষতা অর্জন করেছে। কিন্তু নগরের জঞ্জাল তার সামনে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। পুনরাবৃত্তিমূলক প্যাটার্নই এ সমস্যার মূলে।

গণিতবিদ জ্যঁ ব্যাপটিস্ট জোসেফ ফুরিয়ের দেখিয়েছেন, বিভিন্ন আকার, আকৃতি, দিক ও অবস্থানের সমন্বয়ে গঠিত ডোরাকাটা প্যাটার্নের দৃশ্য আমরা সব মিলিয়ে দেখি। অর্থাৎ এসব দৃশ্যের মধ্যে কোনো বিভেদরেখা আমরা দেখতে পাই না।

প্রকৃতিতে সাধারণত পাশাপাশি আলাদা বস্তুর মধ্যে স্থানিক দূরত্ব বেশি অর্থাৎ ডোরা দাগগুলো হয় বেশ বড় হলে বৈসাদৃশ্য প্রবল হয়। আর স্থানিক দূরত্ব কম অর্থাৎ ছোট ডোরা দাগ থাকলে বৈসাদৃশ্য কম হয়। স্থানিক দূরত্বের পৌনপনিকতা ও বৈসাদৃশ্যের মধ্যে এ সাধারণ সম্পর্ককে বলা যেতে পারে ‘প্রকৃতির নিয়ম’। সহজ করে বললে, ডোরাবিশিষ্ট কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য এমন যেন একটি ডোরা আরেকটিকে অদৃশ্য করে দিচ্ছে। ফলে আমরা চূড়ান্তভাবে এমন একটি ছবি দেখছি যেখানে কোনো পার্থক্যকারী ডোরাদাগ নেই।

কিন্তু নগরের পরিবেশে এমন দৃশ্য দেখা যায় না। নগরের দৃশ্য প্রকৃতির নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায়। এখানে থাকে নিয়মিত, পুনরাবৃত্তিমূলক প্যাটার্ন। নগরের অবকাঠামোর সাধারণ নকশা যেমন জানালা, সিঁড়ি, রেলিং ইত্যাদির কারণেই এমনটি হয়। প্রকৃতিতে এরকম নিয়মিত প্যাটার্ন খুব বিরল।

নগরের স্থাপত্যের এই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক প্যাটার্ন প্রকৃতির নিয়মকে ভেঙে ফেলে। এ ধরনের দৃশ্য প্রক্রিয়া করা মানুষের মস্তিষ্কের কাছে বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর এ কারণে নগরের অট্টালিকার দিকে তাকালে অস্বস্তি বোধ হয়। একইভাবে ডোরম্যাটস, কার্পেট এবং চলন্ত সিঁড়ির প্যাটার্নও একই কারণে মাথাব্যথা এমনকি মৃগী রোগের মতো খিঁচুনির সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সিএনএনে প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অব এসেক্সের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক আর্নল্ড জে উইলকিনসের নিবন্ধ অবলম্বনে