মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আসলে মস্তিষ্কের ভেতরে কি ঘটে? বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে বড় এক পদক্ষেপ নিয়েছেন তারা। বিশ্বের ২২টি গবেষণাগার একসঙ্গে কাজ করে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের মানচিত্র বা ব্রেন ম্যাপ প্রকাশ করেছে। এতে প্রথমবারের মতো দেখা গেছে— সিদ্ধান্ত নেয়ার মুহূর্তে মানুষের পুরো মস্তিষ্ক একসঙ্গে সাড়া দেয়।
এ গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে ১৩৯টি ইঁদুর। তাদের মস্তিষ্ক থেকে একসঙ্গে রেকর্ড করা হয়েছে ৬ লাখের বেশি স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ। কোষগুলো ইঁদুরের মস্তিষ্কের প্রায় ৯৫ শতাংশ অংশজুড়ে বিস্তৃত।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী পল ডব্লিউ গ্লিমচার এ উদ্যোগকে 'ইতিহাসের অন্যতম বড় ঘটনা' বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, এত বিশাল তথ্যভান্ডার আগে কখনো কল্পনাই করা হয়নি।
পুরো গবেষণা শেষ করতে লেগেছে সাত বছর। গবেষণাটির একটি পরীক্ষায় ইঁদুরদের এক ধরনের ভিজ্যুয়াল গেম খেলতে দেয়া হয়। এতে তারা চাকা ঘুরিয়ে পর্দায় সাদা-কালো দাগওয়ালা বৃত্তকে মাঝখানে আনতে পারলে পুরস্কার হিসেবে পেত মিষ্টি পানি। এ সময় মস্তিষ্কে বসানো বিশেষ ইলেকট্রোড ‘নিউরোপিক্সেলস’ হাজার হাজার স্নায়ুকোষের বৈদ্যুতিক সংকেত রেকর্ড করে।
ফলাফলে দেখা গেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হলে প্রথমে মস্তিষ্কের পেছনের অংশ অর্থাৎ দৃষ্টিগ্রাহ্য অংশ সক্রিয় হয়। এরপর ধাপে ধাপে সংকেত ছড়িয়ে পড়ে অন্য অংশে, বিশেষ করে মোটর নিয়ন্ত্রণের অংশে, যখন ইঁদুর চাকায় ঘোরানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্তের পর পুরস্কার পেলে পুরো মস্তিষ্ক যেন আনন্দে একসঙ্গে আলোড়িত হচ্ছে।
এর আগে ধারণা ছিল, সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য মস্তিষ্কের কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশ কাজ করে। কিন্তু সদ্য প্রকাশিত ব্রেনম্যাপ প্রমাণ করল, আসলে পুরো মস্তিষ্ক মিলে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়।
ইউনিভার্সিটি অব জেনেভার স্নায়ুবিজ্ঞানী আলেকজান্দ্রে পুজে বললেন, 'আমরা শূন্য থেকে শুরু করেছিলাম। এত বড় কিছু করা যে সম্ভব তা আগে কেউ চিন্তাই করেনি।’
গবেষণার আরেকটি বড় আবিষ্কার হলো পূর্বজ্ঞান বা অভিজ্ঞতার ভূমিকা। পরীক্ষার সময় কখনো বৃত্তটিকে প্রায় অদৃশ্য করে দেয়া হতো। তখন ইঁদুর তার আগের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিত। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সবসময় শুরুতেই পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগায়।
গবেষকরা বলছেন, এটি মস্তিষ্কবিজ্ঞানের জন্য অনেকটা ডিজিটাল স্কাই সার্ভের মতো একটি বড় উদ্যোগ, যা মহাকাশের মানচিত্র তৈরি করেছিল আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে। একইভাবে আন্তর্জাতিক ব্রেন ল্যাবরেটরিও চায়, এ ব্রেন ম্যাপ হবে ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে যৌথ গবেষণার সূচনা।
—সিএনএন










