এখন পর্যন্ত বড়সর মাপের বেশ কয়েকজন সেলিব্রেটির কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মনে একটি ধারণা উসকে দিয়েছে, সেটি হলো: মহামারীর মতো বৈশ্বিক ও সর্বব্যাপী সঙ্কটকালে সেলিব্রেটিরা বুঝি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছেন। খ্যাতি নিয়ে সাধারণ মানুষের অবসেশন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এই সময়েও দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তারা মরিয়া। বিখ্যাতরা সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। এর মধ্যে তাদের বিলাসবহুল ম্যানশনে ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্ট করছেন, ভাঙা ভাঙা গলায় গান গাইছেন। কেউ আবার কবিতা আবৃত্তি করছেন, অনেকে বাসন মাজাও শেখাচ্ছেন!

বলতে গেলে এই কভিড-১৯ মহামারীকালে সেলিব্রেটিরাই সবচেয়ে বিরক্তিকর প্রাণিতে পরণিত হয়েছেন! মার্চ থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় নির্বিচারে লকডাউন শুরু হওয়ার পর ধনী ও বিখ্যাত সেলিব্রেটিরা বেশ বিরক্তি উৎপাদন করতে পেরেছেন!

শুরুতেই নাম করা যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত রিয়েলিটি শো সেলিব্রেটি এলেন ডিজেনারেস- এর। তিনি তার মাল্টি মিলিয়ন ডলার মূল্যের ম্যানশনের সোফায় শুয়ে থাকার ছবির সঙ্গে মজা করে স্ট্যাটাস দিলেন, ‘যেন আছি এক কারাগারে!’। একই ভাব নিলেন কিশোরীদের হার্টথ্রুব জাস্টিন বিবার। তিনিও তার প্রাসাদে কষ্টে থাকার কথা জানালেন ভক্তদের। বলছেন, কিন্তু ব্যাপারটা বুঝলেন তো, এইখানে আসা পর্যন্ত আমরা অনেক কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমাদের কাছে তো খুব একটা খারাপ মনে হচ্ছে না।

আরেক রিবক্তি উৎপাদন করেছেন ওন্ডার ওম্যান খ্যাত গল গাদত। লকডাউনে তিনি তার নতুন প্রতিভা দেখাতে গিয়ে মানুষকে খেপিয়ে তুলেছেন। বহু সেলিব্রেটির সঙ্গে তিনিও জন লেলনের ‘ইমাজিন’ গান গেয়ে যে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন নিজেই জানে না! লেলনের সীমানা, জাতি ধর্মহীন, মৃত্যুহীন স্বপ্নরাজ্যের সঙ্গে এই মহামারীকালে কী মিল তিনি পেয়েছেন কে জানে! অবশ্য সমালোচনার মুখে সেই ভিডিও তিনি সরিয়ে ফেলেছেন। এর আগে এক স্ট্যাটাসে লেখেন, এইখানে এসে আমরা সবাই এক হয়েছি। 

আরেক বিরক্তিকর বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন পপ সম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা। কভিড-১৯ কে তিনি আশীর্বাদই বলতে চাইছেন। তিনি এই মহামারী সৃষ্টিকারী ভাইরাসকে বলছেন, ‘মহান সমতা বিধানকারী’। তবে জবাবে অনেকেই বলেছেন, হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে আপনিও কিন্তু সমান বিরক্তিকর!

কভিড-১৯ এতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং এতো দ্রুতই সবকিছু বদলে দিচ্ছে যে পরিস্থিতি বুঝে ওঠা সবার পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্য সব খাতের মতো সেলিব্রেটি সংস্কৃতিও এর প্রভাবমুক্ত নয়। এই সঙ্কট পরিস্থিতিতে তারাও তাদের মতো করে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন। তবে সমস্যা হচ্ছে, সোস্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে তারা যেভাবে মহামারী পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন তা স্বাভাবিক সময়ে আমজনতার হাততালি পাওয়ার খায়েশে আত্মপ্রচারের বেশি কিছু নয়। বরং তাদের আত্মপ্রেম আর অগ্রাধিকারপ্রাপ্তি বোধের গভীরতা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত মাসে নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে যথার্থই বলেছে, প্রশ্নের মুখে সেলিব্রেটি সংস্কৃতি। ভ্যানিটি ফেয়ার বলছে, এই মুহূর্তে ভালো কোনো সেলিব্রেটি খবর নেই।

এতো গেল পশ্চিমের খবর। এদিকে বলিউডের সেলিব্রেটিরা কম যাচ্ছেন না। এখানে নায়িকারা বাসন মাজা শেখাচ্ছেন, বিশ্রি গলায় গান গেয়ে নতুন প্রতিভার প্রমাণ দিচ্ছেন, কেউ আবার কবিতা আবৃত্তি করছেন, কেউ কবিতা লিখছেন।

বাংলাদেশের ছোট পর্দার নব্বুইয়ের দশকের জনপ্রিয় মুখগুলো ফেসবুকে ছন্দে ছন্দে করোনা সচেতনতা প্রচার করেছেন। এ নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় প্রশংসার বন্যা বয়ে গেছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো: তাদের একজনও দেশে নেই। দূর দেশ থেকে দেশের সংস্কৃতি জগতে তারা কোনো অবদান রাখছেন বলেও জানা নেই। হালের দুই অভিনেত্রী মডেল অবশ্য রাস্তার অভুক্ত কুকুরদের খাবার দিয়ে এপার-ওপার দুই বঙ্গেই সুনাম কুড়িয়েছেন!

অবশ্য ঢালাওভাবে সেলিব্রেটিদের অভিযুক্ত করা যাচ্ছে না। আমরা হলিউডের টম হ্যাঙ্কস দম্পতি, বলিউডের সালমান, শাহরুখ, আমির, অমিতাভ আর অক্ষয় কুমারের মতো সেলিব্রেটিদেরও দেখেছি। এই মহামারী সঙ্কটে তাদের ভূমিকা তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।

টম হ্যাঙ্কস ও রিটা উইলসন দম্পতি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তারা এই ভয়াবহ মুহূর্তটি যেভাবে সামলেছেন, মানুষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন তা মহামারী মোকাবেলায় সবাইকে সাহস যুগিয়েছে।

মিরা সায়াল ও নটি বয় তাদের প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করেছেন ব্রিটেনে এশীয়, কৃষ্ণাঙ্গ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য পরামর্শ পৌঁছে দিতে। এই কমিউনিটির মধ্যে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি। 

জন ক্রাসিনস্কি তার ইউটিউব চ্যানেলে ‘গুড নিউজ’ নামে শো চালু করেছেন। সেখানে শিক্ষার্থীদের আনন্দদান এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের তাদের প্রিয় বেসবল টিমের খেলা দেখার টিকিট পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করছেন।

এমন সময়ে একেবারে নিঃস্বার্থভাবে কিছু্ একটা করা, সেটি সামান্য হলেও মানুষের মনে বড় আবেদন তৈরি করে। যেমন রিয়ান্নাকে অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন আপনার পরবর্তী অ্যালবামের খবর কী? রিয়ান্না মুখে উপর বলে দিয়েছেন, আমি এখন পৃথিবীকে রক্ষার চেষ্টা করছি। ভক্তরা এই প্রতিক্রিয়া দারুণ পছন্দ করেছেন। অনেকে বলেছেন, এই কারণেই আমি কিকিকে পছন্দ করি। অন্যরা যখন বিলাসবহুল বাড়িতে বসে লেকচার মারছেন তখন রিয়ান্না কিছু একটা করার চেষ্টা করছেন। করোনা মোকাবেলায় তিনি এরই মধ্যে বড় অংকের অর্থও দান করেছেন।

বড় বিনোদন তারকার সঙ্গে বহু মানুষের সম্পৃক্ততার ধরনটি নির্ধারিত হয় অনেক সময়ই এই সামান্য বিরক্তি প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এই সময় সারা দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষ ঘরে বন্দি, স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আটকে আছে চোখ। হতাশা ঝেরে ফেলার জায়গা নেই। যারা ইতিবাচকভাবেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান এবং তাদের অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে বাঁচারও অবলম্বন এটি, তাদের কাজের ক্ষেত্রও যারপর নাই সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। ফলে অনেকে তার স্মার্টফোনকে অবলম্বন করছেন। এই একটিমাত্র মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে মরিয়া আচরণ করছেন তারা।

লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস রোজেক বলেন, এই সময় আমরা যদি এমন দুনিয়ায় বসবাস করি যেখানে রাজনীতিকের চাইতে সেলিব্রেটিরা বেশি গুরুত্ব পায় এবং তারা সত্যিই রাজনীতিকের কাজটা করতে পারে, তাহলে ধরে নিতে এটার কারণ হলো এটিকে তারা বেশি বাস্তব বলেই মনে করছে। 

গত শতক থেকে সেলিব্রেটিরা মানুষের আরো কাছকাছি আসতে শুরু করেছে। রেডিও, টিভি এবং সর্বশেষ ইন্টারনেট তাদের মানুষের বেডরুমে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে।

ফেসুবক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার দর্শকদের কাছে সেলিব্রেটিদের উপস্থিতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা দৈনিক তাদের কথা ও জীবনের গল্প বলছে, এতে আমরাও আমাদেরটা বুঝতে পারছি। ফলে পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক কেবল তখনই তারা আমাদের সঙ্গে একটা লাভজনক সম্পর্ক তৈরি করতে পারছেন। এই উপস্থিতির মধ্যে ‘আপনি তাদের প্রতি এবং তারা যা বলছে তার প্রতি আস্থা রাখতে পারেন, কারণ রাজনীতিকদের চাইতে তাদেরকে নিজের পক্ষের লোক বলে মনে হওয়ার’ একটা অনুভূতি কাজ করে। যোগ করেন রোজেক।

একুশ শতকের বিশ্বে সেলিব্রেটিদের কতোটা প্রাসঙ্গিক করো তোলা সম্ভব এটি নিয়ে উচ্চাশা না করাই ভালো। তাদের অস্তিত্ব এখন অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। রান্নাঘর থেকে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত সেলিব্রেটিদের আনাগোনা। এটা এখন নিয়ম ও মূল্যবোধ হয়ে গেছে। অবশ্য ব্যাপারটাকে অতোটা অশুভ তা বলা যাবে না: টম হ্যাঙ্কস করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন বলতে গেলে তার কারণেই প্রেসিডেন্ট বাদে অধিকাংশ আমেরিকান করোনাভাইরাসকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে শুরু করে।

প্রফেসর রোজেক বলেন, সুপারস্টাররা যখন শহর থেকে দূরে তাদের বিশাল আলিশান বাড়ি থেকে নানান বার্তা দেন, এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় তারা আসলে সাধারণের ‘ধরা ছোঁয়ার বাইরে’। তারা সেখান থেকে বলেন, আমরা সবাই একসঙ্গে এর মোকাবেলা করবো। কিন্তু আসল কথা হলো সেলিব্রেটিদের থেকে সাধারণ মানুষ যোজন যোজন দূরে। লকডাউনের এই সময়টা সেলিব্রেটিদের আরো গভীরভাবে বুঝতে সহায়তা করছে।

এখানে মজার ব্যাপার হলো, তাদের সঙ্গে এই দূরত্বটা আমাদের অজানা নয়। কভিড-১৯ মহামারীতে এসে এলেন ডিজেনারেস, বেকহ্যাম বা গল গাদতদের তুলোধুনো করার দরকার নেই। ধরা যাক, ২০১০ এর দশকের কার্দাশিয়ান বংশের কথা। এরা সেলিব্রেটি হয়েছেই ঘরে থেকে, ভার্চুয়াল জগতে। তারা এখন বিশাল ব্র্যান্ড। অথচ এই রাজ্যের বড় অংশই কিন্তু লস আঞ্জেলেসের প্রাসাদকেন্দ্রিক।  

তাহলে কেন আমরা এই সময়ে এসে তাদের প্রতি রূঢ় হচ্ছি। এর আগে ভাবা উচিত, আমরা প্রায় সবাই কিন্তু তাদের মতো জীবনের আকাঙ্ক্ষা করি। অনেকেরই অবচেতন মন চায় তার জীবনটা যদি কেন্ডাল জেনারের মতো হতো! এখন লকডাউনের এই সময় যখন আয় উপার্জনের পথ বন্ধ তখন তাদের সঙ্গে সাধারণের পার্থক্যের চিত্রটা স্পষ্ট ও কর্কশ চেহারা নিয়ে সামনে হাজির হয়েছে, এই যা।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে জাহাঙ্গীর আলম