এক রহস্যময় দুনিয়া অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকূলের ইলওয়ারা অঞ্চল। যেখানে রাতের অন্ধকারে দেখা যায় প্রকৃতির জীবন্ত আলোকসজ্জা। প্রাকৃতিক রহস্যময় এই আলো পর্যটকদের চোখ ও হৃদয়কে আলোকিত করার পাশাপাশি মৃগ্ধতা সৃষ্টি করে প্রকৃতির সূক্ষ্ম সৌন্দর্যের প্রতি।
ডেভিড ফিনলে—একজন পরিবহন ব্যবস্থাপক। তবে রাত নামলেই এই পরিবহন বিশেষজ্ঞের ভেতরকার পর্যটনপ্রেমী সত্তা জেগে ওঠে। রাত হলেওই তিনি বের হন এমনসব প্রাণীর সন্ধানে, যারা অন্ধকার আলো দেয়। তার এই অদ্ভুত রহস্যময় অভিযানে ধরা পড়ে এমন অনেক রহস্যময় আলোকিত প্রাণী বা উদ্ভিদ—যেগুলোকে সাগরের ঝিলিক, ভূত মাশরুম, জোনাকি এবং আলো ছড়ানো লার্ভা বা গ্লো-ওয়ার্ম বলে চেনা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার ইলওয়ারা অঞ্চলের আলোকিত জীবের সন্ধান পাওয়া অতো সহজ নয়। জীবজ্যোতির এই প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো শুধু কিছু নির্দিষ্ট জায়গায়ই দেখা যায়, যেখানে আলো দূষণ নেই, বেশি আর্দ্রতা এবং উপযুক্ত তাপমাত্রার আবহাওয়া থাকে। ইলওয়ারা অঞ্চলের বিশেষত্ব হলো এখানে কম আলোর দূষণ এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়, যা জীবজ্যোতির প্রাণীদের জন্য আদর্শ আবহাওয়া তৈরি করে।
ফিনলে বলেন— ‘এটা আমাদের এসকার্পমেন্ট পরিবেশের বিশেষত্ব। এখানে অবস্থিত সাব ট্রপিকাল রেইনসফরেস্ট যথাযথ অবস্থায় থাকে, যা এই জীবজ্যোতির প্রাণীদের সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে।’ তার মতে, আর এ কারণেই ইলওয়ারা এলাকায় বিভিন্ন আলোকিত প্রাণী দেখা যায়, যার মধ্যে অন্যতম সাগরের ঝিলিক, ভূত মাশরুম ও জোনাকি পোকা।
একবার ফিনলে রাতের এ অভিযানে নিয়ে যান তার ফেসবুক ফলোয়ারদের। অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে নদীতে দেখা যায় নক্ষত্রের মতো ঝিকমিক করতে থাকা ঝলমলে আলো। ফিনলে বলেন, ‘ক্যাসকেড ফলস এলাকায়, আমরা হাঁটছি, মাথায় টর্চের লাল আলো জ্বালিয়ে, যাতে প্রাকৃতিক জীবজ্যোতির কোনো ক্ষতি না হয়। আমাদের চোখ ধীরে ধীরে এই পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে থাকে। গাছের শিকড়, শীতল মাশরুমের ক্যাপ—সব কিছু যেন এক রহস্যময় জগৎ।’ ফিনলে সতর্ক করে বলেন, ‘যদি কিছু উড়ে আপনার সামনে চলে আসে, সেটা হতে পারে এক মাইক্রো ব্যাট। এগুলো খুব নিরীহ, শুধু খাবার খুঁজছে।’
ফিনলে বলেন, ‘এখানকার জোনাকি জিনিসটা মূলত এক ধরনের গ্লো-ওয়ার্ম, যা ছত্রাক গ্ন্যাটের লার্ভা। এটা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নিজস্ব একধরনের প্রাকৃতিক ঘটনা। এগুলো গুহা, গহ্বর বা অন্ধকার বনে থাকে এবং রাতের অন্ধকারে আলো জ্বেলে শিকার ধরে।’
এ ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য, ফিনলে তার দর্শকদের কিছু নিয়ম-কানুন মানার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘অনেক সময়, মানুষ যেসব স্থান সম্পর্কে জানতে চায়, সেগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। তবে একসঙ্গে বেশি মানুষ গেলে ওইসব স্থান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর এসব প্রাকৃতিক আলো অবশ্যই ছোঁয়া যাবে না, কারণ সেগুলোর ওপর কোনো স্পর্শ বা উচ্চশব্দ ক্ষতির কারণ হতে পারে করতে পারে।’
ফিনলে বলেন, ‘জোনাকির মতো প্রাণী, যেগুলো বেশী আলোকিত, তাদের জন্য একমাত্র বড় নিয়ম হলো—দেখো, কিন্তু ধরো না। এ ধরনের প্রাণীকে যদি আপনি সামান্য স্পর্শ করেন, তবে তারা নির্ঘাত মারা যাবে। তাই এই অভিযানে আমাদের শান্তভাবে চলতে হয়, যেন জীবজ্যোতির প্রাণীরা তাদের নিস্তব্ধ জীবনে ব্যাঘাত না পায়।’
তবে আলোকিত প্রাণীদের এই মেলা শুধু বছরের নির্দিষ্ট সময়েই দেখা যায়। জোনাকি সাধারণত সারা বছর দেখার সুযোগ থাকে, কিন্তু অন্যান্য প্রাণী যেমন ফায়ারফ্লাই ও ভূত মাশরুম নির্দিষ্ট সময় ছাড়া দেখা যাবে না। ফায়ারফ্লাই সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেখা যায়, এবং ভূত মাশরুমগুলোর দেখা মিলবে শীতকালে—মার্চ থেকে মে।
ফিনলে বলেন, ‘এটি এমন এক জগৎ, যেখানে প্রতি পদক্ষেপে কিছু নতুন কিছু দেখতে পাওয়া যায়।’
অস্ট্রেলিয়ায় ‘বায়োলুমিনেসেন্স অস্ট্রেলিয়া’ নামক একটি ফেসবুক গ্রুপ এরই মধ্যে ৬৪ হাজার মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। এখানে মানুষ শুধু ছবি শেয়ার করে না, বরং জীবজ্যোতির স্থান সম্পর্কে তথ্যও বিনিময় করে। ডেভিড ফিনলে বলেন, ‘এটা যেন সোনা খোঁজার মতো—খুঁজে পাওয়া সহজ নয়, কিন্তু পেলে সবাই সেটি গোপন রাখতে চায়।’










