বিবিসির খবর জানায়, ২০১২ সালে ইন্ডিয়ানার একটি অ্যামিশ পল্লী ও সাউথ ডাকোটার হাটারাইট সম্প্রদায়ের শিশুদের ওপর গবেষণা চালায় একদল বিজ্ঞানী। উভয় গোষ্ঠীই কৃষিনির্ভর, ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত এবং আধুনিক জীবনের দূষণ থেকে দূরে থাকলেও, হাটারাইট শিশুদের মধ্যে হাঁপানি ও অ্যালার্জির হার অ্যামিশদের তুলনায় চার থেকে ছয় গুণ বেশি পাওয়া যায়।
গবেষকরা বলছেন, দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে মূল পার্থক্য হলো—অ্যামিশরা ছোটবেলা থেকেই গবাদিপশুর সংস্পর্শে বড় হয়, যেখানে হাটারাইটরা শিল্পজাত কৃষিপদ্ধতির কারণে পশুদের থেকে দূরে থাকে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্কের মেডিসিন অনুষদের অধ্যাপক এমেরিটাস ফারগাস শ্যানাহান বলেন, ‘অ্যামিশদের গ্রামগুলোতে পশুরা মানুষের আশপাশেই থাকে। বিপরীতে হাটারাইটদের খামার থাকে বাড়ি থেকে অনেক দূরে।’
দুই গোষ্ঠীর বাড়িঘর থেকে সংগ্রহ করা ধুলার নমুনায় দেখা যায়, অ্যামিশ শিশুদের ঘরে হাটারাইটদের তুলনায় বেশি জীবাণু রয়েছে, যা প্রধানত গবাদিপশুর মাধ্যমে ছড়ানো। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির গবেষকেরা এক যুগান্তকারী গবেষণায় দেখান, অ্যামিশ শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বিশেষভাবে রেগুলেটরি টি সেল সমৃদ্ধ, যা অস্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দমন করতে সাহায্য করে।
বিশ্বজুড়ে অনুরূপ গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ছোটবেলা থেকে পশুর সংস্পর্শে বড় হয়, তারা হাঁপানি ও অ্যালার্জির ঝুঁকি থেকে অনেকটাই মুক্ত। বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘মিনি-ফার্ম এফেক্ট’ নামে অভিহিত করেছেন।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ্যাক গিলবার্ট বলেন, ‘একটি খামারে বড় হলে হাঁপানি বা অ্যালার্জি হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এমনকি ঘরে কুকুর থাকলেও সেটি ১৩-১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে।’
অ্যামিশদের গবেষণা প্রকাশের পর থেকেই শৈশবে পশুর সংস্পর্শে থাকার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। এমনকি নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলে—পোষা প্রাণী কি নতুন প্রোবায়োটিক?
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাণীর লোম বা পায়ের মাধ্যমে ছড়ানো জীবাণু মানুষের ত্বকে এসে পড়ে। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, পোষা প্রাণীর মাধ্যমে আমাদের শরীরে নতুন ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করছে, যা পরোক্ষভাবে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় রাখছে।
উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগবিষয়ক অধ্যাপক নাসিয়া সাফদার জানান, পোষা প্রাণীদের খাবারে এমন উপাদান সংযোজনের ভাবনা চলছে, যা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটাতে পারে এবং তা থেকে মানুষও উপকৃত হতে পারে।
তবে অধ্যাপক গিলবার্ট এই তত্ত্বে পুরোপুরি একমত নন। তিনি বলেন, ‘কুকুর বা বিড়ালের ব্যাকটেরিয়া আমাদের ত্বক বা অন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাস করে এমন প্রমাণ নেই। তারা ক্ষণিকের জন্য আসে, তারপর চলে যায়।’
গিলবার্টের মতে, মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সহস্রাব্দ ধরে পশুর জীবাণুর সঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। যদিও এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শরীরে স্থায়ীভাবে থাকে না, তবুও রোগপ্রতিরোধ কোষ তাদের চিনে নেয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাড়া দেয়।
অন্যদিকে, গবেষণায় দেখা গেছে, পোষা প্রাণীর সঙ্গে একই ঘরে থাকা মানুষদের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া একে অপরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে পশুরা জীবাণুবাহক হিসেবে কাজ করতে পারে।
আয়ারল্যান্ডের গৃহহীন যাযাবর জনগোষ্ঠী ‘ট্রাভেলারদের’ নিয়ে অধ্যাপক শ্যানাহানের গবেষণায় উঠে এসেছে, তাদের অন্ত্রের জীবাণু গঠন প্রাক-শিল্পযুগের মানুষের মতো—যেমন তানজানিয়ার আদিবাসী বা মঙ্গোলিয়ান যাযাবরদের মতো যারা আজও পশুর সংস্পর্শে জীবনযাপন করে। অধ্যাপক শ্যানাহানের ভাষায়, ‘আইরিশ ট্রাভেলাররা তাদের প্রাচীন মাইক্রোবায়োম ধরে রেখেছে। এটা অনেকটাই সেই জীবনযাত্রার প্রতিফলন, যেখানে মানুষ আর পশু একে অপরের কাছাকাছি থাকত।’
বর্তমানে বিভিন্ন গবেষক পোষা প্রাণীকে জীবনের নানা পর্যায়ে পুনরায় যুক্ত করার সম্ভাব্য উপকারিতা অনুসন্ধান করছেন। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে। যেখানে দেখা হচ্ছে, বয়স্কদের সঙ্গে পোষা কুকুরের সহাবস্থানে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় কিনা।
এছাড়া ইতালির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে শিশুরা ঘরে পোষা প্রাণী না থাকলেও ঘোড়ার সংস্পর্শে এসেছে, তাদের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ায় উপকারী পরিবর্তন হয়েছে।
অধ্যাপক গিলবার্ট বলেন, ‘নানা রকম জীবাণুর সংস্পর্শ আমাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অধিক প্রশিক্ষিত করে তোলে। তবে আমরা পশুর জীবাণুতে আক্রান্ত হই না, বরং তারা আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জাগিয়ে তোলে।’
ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্কের অধ্যাপক লিয়াম ও’মাহোনি জানান, পোষা প্রাণী থাকা মানে শুধু জীবাণুর সংস্পর্শ নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তিনি বলেন, ‘যদি আপনি কুকুর পোষেন, তাহলে আপনি পার্কে হাঁটতে যান, মাটির সংস্পর্শে আসেন—এসব থেকেই আসে উপকারী জীবাণু।’










