কভিড-১৯ মহামারীতে বিশ্বজুড়ে লকডাউনের কারণে অন্য অনেক তৎপরতার পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মাদক চোরাচালানও। মাদকের আন্তর্জাতিক সরবরাহ তলানিতে। এটিকে সাদা চোখে খুব ইতিবাজক বলে মনে হলেও বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কারণ এতে নেশাগ্রস্ত বা নিয়মিত মাদক নিয়ে থাকে এমন ব্যক্তিরা বিকল্প খুঁজতে শুরু করবে। সে বিকল্প হতে পারে স্বাস্থ্যের জন্য আরো মারাত্মক। এতে এই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে মৃত্যুহার হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ লকডাউন পরিস্থিতির ফলাফল মাদকসেবী গোষ্ঠীর মধ্যে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কারণ এতে তারা আরো ঝুঁকিপূর্ণ মাদক বা অভ্যাসে ঝুঁকে পড়তে পারে। অথবা বিকল্প হিসেবে অপরিচিত কোনো ড্রাগ গ্রহণ শুরু করতে পারে, আবার কেউ মাদক গ্রহণ বন্ধ করে দিতেও পারে। এটি হবে বিপজ্জনক। কারণ অতিরিক্তি মাদক গ্রহণে অভ্যস্তদের এমনিতেই অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে।

এদিকে করোনা মহামারীতে সরবরাহ সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কায় এরই মধ্যে মাদকসেবীরা পছন্দের নেশাদ্রব্য (ড্রাগ) মজুদ করতে শুরু করেছে। ডার্কওয়েবে মাদকের বেচাকেনার পরিসংখ্যান দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

ব্রিটেনের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আয়ান হ্যামিলটন সিএনএনকে বলেছেন, মাদকসেবীরা তাদের পছন্দের ড্রাগ মজুদ করছে এমন খবর শোনা যাচ্ছে। অবশ্যই এতে ড্রাগের ঘাটতি তীব্র হবে, এরই মধ্যে অনিবার্যভাবে তা ড্রাগের দাম বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে যুক্তরাজ্যে খুব দ্রুত হেরোইন অদৃশ্য হয়ে যাবে বলে মনে করছেন তিনি।

ট্রান্সফর্ম ড্রাগ পলিসি ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক স্টিভ রোলস বলেন, ড্রাগের দাম বৃদ্ধির প্রমাণ রয়েছে... এবং এটি অবাক হওয়ার মতো বলে মনে হয় না। ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে সম্ভবত হেরোইনের মতো ড্রাগগুলোর সরবরাহ সীমিত হতে চলেছে। এতে করে ড্রাগের পরিবহন ও বণ্টন আরো চ্যালেঞ্জিং হতে চলেছে। আমি মনে করি, কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে আমরা হেরোইনের মতো ড্রাগগুলো আর দেখতে পাব না। 

কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফৌজদারি বিচার বিভাগের অধ্যাপক অ্যালেক্স স্টিভেনস বলেন, বার্মিংহাম ও ব্রিস্টলসহ আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে হেরোইন ও সিন্থেটিক ক্যানাবিনোইডসের মতো ড্রাগ ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, সরবরাহ ঘাটতি ও দাম বেড়ে যাওয়ায় চার বা পাঁচ সপ্তাহ আগের চেয়ে এক একটি ব্যাগে তারা ১০ ডলার সমপরিমাণ অর্থের কম ড্রাগ পাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতির মধ্যেও ক্রেগলিস্টসহ ডার্কওয়েব ও অন্য সাইটগুলো এখনো চোরাকারবারিরা সক্রিয় রয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী এমন একটি সময়ে সাইটগুলো ব্যবহার করে ড্রাগ কিনে মজুদ করছে, যখন পুলিশ এগুলো নজরদারি করছে না। আর মাদকসেবীরা এখন হেরোইন না পাওয়া গেলেও অন্য কোনো পথ খুঁজে নেবে। অ্যালকোহল, ইনহ্যালেন্টস, বেঞ্জোডিয়াজেপাইন বা অন্য কিছুকে তারা বিকল্প বানিয়ে নিবে। 

যুক্তরাজ্যের জাতীয় অপরাধ এজেন্সির মতে, ২০১০-১১ সালে যুক্তরাজ্যে হেরোইনের ঘাটতির সময়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে ড্রাগের বিশুদ্ধতা ১৮ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ওই সময়ে দাম বৃদ্ধির সঙ্গে হেরোইনের ওভার ডোজের কারণে মৃত্যু হ্রাস পেয়েছিল, কিন্তু বিপরীতে হেরোইনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত মেথাডোন ওভার ডোজে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। যদিও মেথাডোনে মৃত্যুর সংখ্যাটা খুব বেশি ছিল না। 

সেসময় হেরোইনের স্বল্পতা ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে এলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। মাদকাসক্তরা এক্ষেত্রে কম বিপজ্জনক পদ্ধতি ছেড়ে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক নেয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে। তারা বিভিন্ন ড্রাগের এমন সংমিশ্রণ তৈরি করে সেবন করতে পারে যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আর চলমান লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কড়াকড়ির মধ্যে ঘরে একাকী অবস্থান করার সময় এই মাদকসেবীরা আরো আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। তাদের ঘন ঘন মাদক গ্রহণের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যালকোহলিজম অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাবিউজ কাউন্সিলরসের নির্বাহী পরিচালক সিন্থিয়া মোরিনো তুহি বলেন, করোনাভাইরাসের এ সংকটে মানুষজন এমনিতেই উদ্বেগের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। এটা স্বাভাবিকভাবেই আশাহত মানুষদের আরও হতাশার দিকে ঠেলে দেবে। দীর্ঘমেয়াদে হতাশার ফলস্বরূপ আমরা আত্মহত্যা বাড়তে দেখি। সুতরাং আমি জানি না যে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীতে আত্মঘাতী হয়ে ওঠার প্রবণতা চলমান এ সংকটে আরো তীব্র হয়ে উঠছে কিনা।

করোনাভাইরাস মহামারী হওয়ার আগেই বিশ্ব ড্রাগ সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিল। পুরো পৃথিবী হেরোইনের মতো ড্রাগগুলোর সঙ্কটের মুখে। ২০১৮ সালে ১২ ও তার চেয়ে বেশি বছর বয়সী ১ দশমিক ৩ কোটি নাগরিক এমন ড্রাগ সেবন করেছে। ২০১৭ সালে ৭০ হাজার ২০০ এর বেশি মার্কিনের ড্রাগ ওভার ডোজের কারণে মৃত্যু হয়েছিল। এর মধ্যে হেরোইন গোত্রের ড্রাগুলোর জন্য মৃত্যু হয়েছিল ৪৭ হাজার ৬০০ জনের।

সূত্র: সিএনএন