ঊনআশি খ্রিস্টাব্দের এক সকাল। ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির ভয়ংকর অগ্ন্যুৎপাত মুহূর্তেই চাপা দিয়েছিল প্রাণচঞ্চল শহর পম্পেইকে। মানুষ, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট— সব কিছুই ছাই হয়ে মিশে গিয়েছিল। আজও সেই জমে থাকা স্তূপ দেখে মনে হয় যেন কোনো এক ভৌতিক টাইম ক্যাপসুল। কিন্তু সাম্প্রতিক খননে পাওয়া প্রমাণ অন্য গল্প বলছে। ধ্বংসস্তূপের ভেতরেও এক সময় মানুষ ফিরেছিল, চেষ্টা করেছিল নতুন করে জীবন গড়ার।

পম্পেই প্রত্নউদ্যানের পরিচালক গ্যাব্রিয়েল জুখট্রিগেল জানিয়েছেন, শহরের দক্ষিণ প্রান্তের ইনসুলা মেরিডিওনালিস এলাকায় খনন করে পাওয়া গেছে ভাঙা হাঁড়ি, পাত্র আর রান্নাঘরের চিহ্ন। এক সময় যে বাড়িগুলো ছিল জমকালো, সেগুলোর নিচতলা ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু উপরের অংশ ব্যবহার করে মানুষ বানিয়েছিল অস্থায়ী চুলা, চাকা, এমনকি ছোট ছোট ওভেন। আশ্চর্যজনকভাবে পাওয়া গেছে একটি মাটির প্রদীপ, যাতে খোদাই করা আছে খ্রিস্টধর্মের অন্যতম প্রাচীন প্রতীক। প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন, এটি পঞ্চম শতকের নিদর্শন।

Capture

ইনসুলা মেরিডিওনালিস প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে খনন কাজ চলছে

অন্য প্রমাণগুলো আরো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। ১৬১ সালের সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের শাসনামলে কেউ একজন পম্পেইতে ফিরেছিল। কারণ খননে ওই সময়ের একটি রোমান মুদ্রা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ অগ্ন্যুৎপাতে শহর ধ্বংস হওয়ার মাত্র কয়েক দশক পরই মানুষ আবারো ধ্বংসস্তূপে ফিরেছিল। তবে এ জীবন ছিল ভীষণ অস্থায়ী আর কষ্টকর।

তাদের কষ্টকে আরো তীব্র করেছিল নতুন বিপর্যয়। ৪৭২ সালে আবারো ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। এবার আর মানুষ টিকতে পারেনি। পুরো শহর ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়। তবুও কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপেই টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল। তারা গাছপালা লাগিয়েছিল, কূপ খুঁড়ে পানি তুলেছিল। এমনকি নবজাতকের কবরও পাওয়া গেছে সে সময়কার।

প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, বেঁচে থাকা মানুষগুলো ছাইয়ের মরুভূমির মাঝেই নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করেছিল। তাদের জীবন ছিল একেবারেই সাধারণ। রান্নাঘরের পাশেই বানানো হতো শৌচাগার। এ সময়টায় আগের জমকালো রোমান জীবন আর ফেরেনি। বরং শহরটা হয়ে উঠেছিল গরিব মানুষের অস্থায়ী বসতি, আজকের ভাষায় যেন ফ্যাভেলা।

প্রাচীন নথিপত্র বলছে, সেই সময় রোমান শাসক টাইটাস বিপর্যস্ত এলাকায় দুজন কনসাল পাঠিয়েছিলেন। তাদের কাজ ছিল মৃতদের সম্পত্তি পুনর্বণ্টন করা, যাতে বিশৃঙ্খলা না ছড়ায়। এমনকি শোনা যায়, সম্রাট নিজেও নাকি ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরটি দেখতে এসেছিলেন।

খননে মিলেছে আরো চমকপ্রদ দৃশ্য, দুটো বিমের মাঝে আটকে থাকা এক ঘোড়ার কঙ্কাল। বোঝা যায়, আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে মানুষ বারবার ইতিহাসের মুখোমুখি হচ্ছিল। যেন ইতিহাস আর বর্তমানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা আবারো বেঁচে থাকার উপায় খুঁজছিল।

Capture

ভিসুভিয়াস অগ্ন্যুৎপাতে পিলারের মাঝে চাপা পড়ে থাকা ঘোড়ার কঙ্কাল

গবেষকেরা বলছেন, যদিও এখনো জানা যায়নি ওই সময়ের মানুষরা কীভাবে জীবনধারণ করত, কীভাবে পুরোনো ধ্বংসাবশেষ থেকে জিনিস সংগ্রহ করত, জমি চাষ করত নাকি নতুন ব্যবসা গড়ে তুলেছিল— সেই রহস্য এখনো জানা বাকি রয়েছে।

মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ মার্সেলো মোগেত্তা বলছেন, পম্পেই প্রত্নউদ্যানের এ খনন কাজ শহরটির অদৃশ্য ইতিহাস তুলে ধরছে। এতদিন অগ্ন্যুৎপাতের ভয়াবহতাই সব দখল করে রেখেছিল, কিন্তু আসল গল্পটা আরো হৃদয়স্পর্শী।

পম্পেইয়ের সেই ভুলে যাওয়া গল্পগুলো আজ আবার উঠে আসছে আলোয়— ধ্বংসস্তূপের ভেতরেও যে মানুষ জীবনের সন্ধান করে, তারই প্রমাণ রেখে গেছে প্রাচীন এ শহর।

—সিএনএন