মাংসাশী ডাইনোসরদের মধ্যে সবচেয়ে বড়গুলোর একটি স্পাইনোসরাস, যার নতুন এক প্রজাতির জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। নাইজারের সাহারা মরুভূমির এক প্রত্যন্ত ও বিরান এলাকায় পাওয়া প্রজাতিটির বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে বড় ও তলোয়ার-আকৃতির মাথার ঝুঁটি। ধারণা করা হচ্ছে, সঙ্গী আকর্ষণে এ ঝুঁটি ব্যবহার করত দানবীয় প্রাণীটি। এছাড়া পিচ্ছিল মাছ ধরার জন্য ব্যবহার করত পরস্পর জড়িয়ে বসা দাঁতসম্বলিত চোয়াল। খবর রয়টার্স।

ডাইনোসরটি বৃক্ষাচ্ছিদ পরিবেশে বিচরণ করত এবং বড় মাছ ধরতে নদীতে নেমে যেত, যা আধুনিক জলচর পাখির বৈশিষ্ট্য। এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪০ ফুট বা ১২ মিটার এবং ওজন ৫-৭ টন।

প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে ক্রিটেশাস যুগে আফ্রিকার ভূ-প্রকৃতি ছিল এখানকার তুলনায় একদমই আলাদা। ওই সময় সেখানকার জলাশয়ে মিলত সিলাক্যান্থের মতো বড় মাছ।

গণনাম স্পাইনোসরাসের অর্থ হলো কাঁটাযুক্ত টিকটিকি। নতুন প্রজাতিটির নাম দেয়া হয়েছে স্পাইনোসরাস মিরাবিলিস। ‘মিরাবিলিস’ শব্দের অর্থ ‘বিস্ময়কর’, যা এর বড় ঝুঁটির প্রতি ইঙ্গিত করে। ‘গণ’ বলতে কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যযুক্ত একাধিক প্রজাতির একটি দলকে বোঝায়। যেমন সিংহ ও বাঘ একই গণভুক্ত হলেও আলাদা প্রজাতি।

‘জুরাসিক পার্ক’ চলচ্চিত্রের কারণে স্পাইনোসরাস বেশ পরিচিত ডাইনোসর। এ সিনেমায় দেখানো প্রজাতিটি হলো স্পাইনোসরাস এজিপটিয়াকাস। ১৯১৫ সালে মিসরে পাওয়া জীবাশ্মের ভিত্তিতে নামকরণ করা হয়েছিল।

স্পাইনোসরাস একমাত্র পরিচিত আধা-জলচর শিকারি ডাইনোসর। আকারে টাইরানোসরাস, গিগানোতোসরাস এবং কারকারোডন্টোসরাসের মতো সবচেয়ে বড় মাংসাশীদের সঙ্গে স্থান করে নিয়েছে প্রাণীটি।

গবেষকরা বলছেন, দুই প্রজাতির স্পাইনোসরাস একই সময়ে বাস করত এবং তাদের দেহের গঠন মোটামুটি একই ছিল। তবে স্পাইনোসরাস মিরাবিলিসের ঝুঁটি স্পাইনোসরাস এজিপটিয়াকাসের তুলনায় অনেক বড়। মুখও বেশি লম্বাটে। দাঁতগুলো পরস্পর থেকে বেশি দূরে অবস্থিত এবং পশ্চাৎপদ ছিল তুলনামূলক দীর্ঘ।

গবেষকেরা বলেন, ঝুঁটিটি সম্ভবত প্রদর্শনের কাজে ব্যবহৃত হতো। কারণ পুরোপুরি কঠিন অস্থি হলেও এটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য বেশ নাজুক ছিল। সম্ভবত গরুর শিংয়ের মতো কেরাটিনে আবৃত ছিল এ ঝুঁটি, যা উজ্জ্বল রঙ ধারণ করত এবং সঙ্গী আকর্ষণ, এলাকা রক্ষা বা পারস্পরিক সনাক্তকরণে ভূমিকা রাখত।

গবেষণার প্রধান লেখক, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর জীবাশ্মবিদ পল সেরেনো বলেন, ‘এটি প্রেম ও জীবনের ব্যাপার। সঙ্গী আকর্ষণ করা, নিজের প্রিয় খাদ্যসমৃদ্ধ অগভীর জলভূমি রক্ষা করা। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কী হতে পারে?’

এ প্রজাতির নাকের ছিদ্র সাধারণ ডাইনোসরের তুলনায় অনেক পেছনে। তাই পানির নিচে মুখের বেশিরভাগ অংশ ডুবিয়ে রেখে শিকার অনুসরণ এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারত। পাশাপাশি ওপরের ও নিচের দাঁতের সারি কামড় দেয়ার সময় নিখুঁতভাবে একে অপরের সঙ্গে মিলে যেত, যাকে বলা হয় ‘ইন্টারডিজিটেশন’।

গবেষণার সহলেখক ও জীবাশ্মবিদ ড্যানিয়েল ভিডাল বলেন, দাঁতগুলো বড়, শঙ্কু আকৃতির এবং খাঁজবিহীন। এগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে এক ধরনের ‘ফাঁদ’ তৈরি করত, যা পিচ্ছিল মাছকে বিদ্ধ করে চোয়ালের মধ্যে আটকে রাখতে খুব কার্যকর ছিল।

স্পাইনোসরাস এজিপটিয়াকাসের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে মিসর ও মরক্কোয়। ক্রিটেশাস যুগে টেথিস সাগরের উপকূলবর্তী ওইসব স্থানে আজকের ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগর অবস্থিত। এ তথ্য এবং কিছু কঙ্কালগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে অনেকে ধারণা করেছিলেন, স্পাইনোসরাস পুরোপুরি জলচর ছিল। সমুদ্রের উন্মুক্ত জলে সাঁতার কাটা ও ডুব দিয়ে শিকার করায় দক্ষ ছিল। কিন্তু স্পাইনোসরাস মিরাবিলিসের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে সমুদ্রতীর থেকে প্রায় ৫০০-১০০০ কিমি ভেতরে। এ তথ্য ও প্রাণিটির শারীরিক গঠনের বিভিন্ন দিক ইঙ্গিত দেয়, স্পাইনোসরাস ছিল অগভীর জলের শিকারি এবং পুরোপুরি জলচর নয়।