বার্ধক্যজনিত কারণে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার স্বাভাবিক ক্ষমতা অনেকাংশেই কমে যায়। ফলে অতিরিক্ত গরম কিংবা তীব্র শীতে অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। তাছাড়া বয়স্কদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগে ভুগছেন, যার কারণে এমন কিছু ওষুধ সেবন করেন, যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা ঘাম নিঃসরণে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, শরীর সহজেই দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাপসংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কাজেই গরমের সময় বয়স্ক ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ সতর্কতা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা এ সময়ে সুস্থ ও নিরাপদ থাকতে পারেন।

গরমে বয়স্কদের যেসব শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়

গরমে বয়স্ক ব্যক্তিরা তাপজনিত যেসব অসুস্থতার ঝুঁকিতে থাকেন, সেগুলোকে সম্মিলিতভাবে ‘হাইপারথার্মিয়া’ বলা হয়। হাইপারথার্মিয়ার মধ্যে রয়েছে—

হিটস্ট্রোক: গরমকালে বয়স্কদের সবচেয়ে বেশি থাকে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি। দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে কিংবা এসির ঠাণ্ডা বাতাসে থাকার পর হঠাৎ ঘরের বাইরে এলে হিটস্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। এ সময় বাইরের প্রচণ্ড তাপের সঙ্গে শরীরের তাপের তারতম্য ঘটে। বাইরের প্রচণ্ড তাপ শরীর সহ্য করতে পারে না। ফলে হিটস্ট্রোক হয়। হিটস্ট্রোকে শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে চলে যায়। হিটস্ট্রোকের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড পিপাসা পাওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তির ঘাম ঝরা বন্ধ হয়ে পানিশূন্যতা দেখা দেয়া, দ্রুত হৃৎস্পন্দন, মাথাব্যথার পাশাপাশি বমিভাব, কথা জড়িয়ে যাওয়া এবং এক পর্যায়ে জ্ঞান হারানো। কখনো কখনো হিটস্ট্রোকের কারণে মৃত্যুও হতে পারে।

হিট এক্সেশন বা গরমজনিত ক্লান্তি: হিট এক্সেশন হলো হিটস্ট্রোকের পূর্ববর্তী অবস্থা, যখন শরীর অতিরিক্ত গরমে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এতে তীব্র ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, ত্বক ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া এবং বমিভাব দেখা দেয়। দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকলে কিংবা প্রচণ্ড গরমে কাজ করলে এমনটি হতে পারে।

হিট ক্র্যাম্প বা খিঁচুনি: গরমকালে পানিশূন্যতার কারণে শরীরে ইলেকট্রোলাইট অর্থাৎ সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে হাত-পা কিংবা কোমরের পেশি সংকুচিত হয়ে যন্ত্রণাদায়ক টান বা খিঁচুনি অনুভূত হয়, যাকে হিট ক্র্যাম্প বলে। হঠাৎ পেশিতে টান লাগা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং ঘাম শুকাতে না পারা, শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া হিট ক্র্যাম্পের লক্ষণ।

হিট র‍্যাশ: সাধারণভাবে আমরা যেটাকে ঘামাচি বলি সেটাই মূলত হিট র‍্যাশ। র‍্যাশ বা ঘামাচি যেকোনো বয়সেই হতে পারে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বক অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। ফলে বয়স্কদের জন্য ঘামাচি খুবই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। এর কারণে ত্বক রুক্ষ ও শুষ্ক হয়ে যায়। তীব্র চুলকানি, জ্বালাভাব ও শরীরে অতিরিক্ত গরম অনুভূত হয়।

সানবার্ন: দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত রোদে থাকলে ত্বকে লালচে ভাব ও প্রদাহ সৃষ্টি হয়। একে সানবার্ন বা রোদে পোড়া বলে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের ঘামগ্রন্থি ও তেলগ্রন্থির কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে অতিরিক্ত রোদে ত্বকের ক্ষতি হয় দ্রুত এবং সহজেই সানবার্নের লক্ষণ দেখা দেয়। তাছড়া বয়স্কদের ত্বক অনেক বেশি পাতলা, কোমল ও সংবেদনশীল হওয়ায় তাদের সানবার্নের ঝুঁকি বেশি থাকে।

পানিশূন্যতা: বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা থাকে অত্যধিক। এ সময় শরীরের মূল তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রায় রাখার জন্য শরীর ঘামের মাধ্যমে অতিরিক্ত তাপ নির্গত করে। ফলে শরীর থেকে পানি বের হয়ে যাওয়ায় তরলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যাকে পানিস্বল্পতা বা ডিহাইড্রেশন বলে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরো গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে তৃষ্ণার অনুভূতি কমে যায়, ফলে তারা অনেক সময় প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি পান করেন না। পাশাপাশি কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাও ধীরে ধীরে কমে আসে, এতে শরীরে তরল ধরে রাখার ক্ষমতা কমে পায়। এসব কারণে গরমে তাদের শরীর সহজেই পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং কিছু ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি দেখা দেয়।

গরমে বয়স্কদের সুস্থ থাকার উপায়

একটু বাড়তি যত্ন ও সচেতনতাই পারে গরমকালেও বয়স্কদের সুস্থ এবং সক্রিয় রাখতে। এজন্য পরিবারের নবীন সদস্যদের উচিত প্রবীণদের স্বাস্থ্য বিষয়ে সতর্ক থাকা, তাদের শারীরিক অবস্থা বুঝে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া এবং কিছু নিয়ম মেনে চলতে সহায়তা করা। জেনে নেয়া যাক গরমে সুস্থ থাকতে বয়স্কদের জন্য করণীয়-

 গরমে পানিশূন্যতা রোধে দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা জরুরি, এমনকি তৃষ্ণা না পেলেও। পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তি পর্যাপ্ত পানি পান করছেন কিনা, এ ব্যাপারে অন্য সদস্যদেরও লক্ষ রাখতে হবে। চা, কফি, কোমলপানীয় শরীরে পানিশূন্যতা বাড়ায়। তাই এগুলো পরিহার করে স্বাস্থ্যকর পানীয় যেমন ডাবের পানি, ফলের রস, লেবু-পানি ইত্যাদি পান করা যেতে পারে। তবে যাদের কিডনির সমস্যা রয়েছে তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানি পান করবেন।

 গরমে অতিরিক্ত তেল-মসলাজাতীয় খাবার না খেয়ে সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফলমূল ও শাকসবজি রাখতে হবে।

 বেলা ১১টা থেকে ৩টার মধ্যে রোদ সবচেয়ে তীব্র থাকে। সম্ভব হলে এ সময় বাইরে না গিয়ে ছায়াযুক্ত শীতল পরিবেশে থাকার চেষ্টা করুন।

 রোদের মধ্যে বাইরে গেলে তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচতে আরামদায়ক পোশাক অর্থাৎ পাতলা, ঢিলেঢালা ও হালকা রঙের সুতির পোশাক পরুন, যা ত্বককে রোদ থেকে রক্ষা করবে এবং শরীর ঠাণ্ডা রাখবে। পাশাপাশি অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন এবং ছাতা বা টুপি পরুন।

 গরমে শরীর সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ক্লান্ত শরীরে ঘুম ঠিকমতো না হলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। এজন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম নিশ্চিত করুন।

 শরীর সুস্থ রাখতে সব বয়সী মানুষেরই ব্যায়াম করা জরুরি। বয়স্কদেরও নিয়মিত কিছু হালকা শরীরচর্চা করা প্রয়োজন। গরমে ব্যায়াম করার সময় প্রয়োজনীয় বিরতি নিন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

 গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা রাখুন এবং নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

লেখক: মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

ল্যাবএইড আইকনিক, কলাবাগান