শিশুরা বিভিন্ন কারণে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, পিত্তনালি পথের ত্রুটি, জন্মগত কিছু রোগ। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জীবাণুঘটিত সংক্রমণ। এ সংক্রমণ যেমন ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া দ্বারা হয়ে থাকে, তেমনি হয়ে থাকে ভাইরাস সংক্রমণ থেকে। এ ভাইরাসগুলোকে ‘হেপাটোট্রপিক ভাইরাস’ বলা হয়। ভাইরাসগুলো পাঁচ শ্রেণীতে বিভক্ত—যথা এ, বি, সি, ডি, ই।

হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাস দূষিত খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। অন্যদিকে হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত রোগীর রক্ত (ব্লাড ট্রান্সফিউশন) রক্তজাত ওষুধ, অপরিশোধিত সিরিঞ্জ, সুচ, রোগীর ব্যবহৃত ক্ষুর, রেজর, ব্লেড, ব্রাশ ইত্যাদির মাধ্যমে শিশু আক্রান্ত হতে পারে। গর্ভবতী মায়ের শরীর থেকেও শিশু হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হতে পারে। গর্ভবতী নারীর শরীরে যদি হেপাটাইটিস বি ভাইরাস থাকে, তবে গর্ভস্থ সন্তান সে ক্ষেত্রে সংক্রমিত হতে পারে। হেপাটাইটিস ডি সর্বদাই বি ভাইরাসের সহযোগী হয়ে আসে।

লক্ষণ: শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিসের উপসর্গ দেখা দেয়। জন্ডিস হলে চোখ, ত্বক হলুদ বর্ণ ধারণ করে। এছাড়া চুলকানি, গাঢ় বাদামি বা কমলা রঙের মূত্র, অন্যান্য পেটব্যথা (বিশেষত পেটের ডান পাশের ওপরের অংশে), মেটে রঙের মল, বমি বমি ভাব, যকৃৎ স্ফীতি, ক্লান্ত, অবসাদ; হেপাটাইটিস বির ক্ষেত্রে বাড়তি কিছু লক্ষণ যেমন গাঁটে ব্যথা, ত্বক চাকা চাকা হয়ে ফুলে ওঠা এসব দেখা যায়। 

হেপাটাইটিস বি, সি বা ডি দিয়ে আক্রান্ত রোগীর অধিকাংশই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে, কিন্তু কখনো কখনো ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায় এবং পরে সক্রিয় হয়ে রোগ বিস্তার ঘটায়। একে বলা হয় ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস এবং তার পরিণামে লিভার ক্যান্সার, সিরোসিস হয়ে থাকে। বিশেষত শিশুজীবনের প্রথম বছরে বি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এ ঝুঁকি বেশি। খুব ছোট শিশু হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলে জন্ডিস নাও থাকতে পারে; বরং বুকের দুধ চুষে না খাওয়া, বমি, অত্যধিক অসুস্থতা—এসব অনির্দিষ্ট লক্ষণ থাকতে পারে।

চিকিৎসা: হেপাটাইটিসের লক্ষণভেদে চিকিৎসার ভিন্নতা রয়েছে। চুলকানির জন্য মুখে খাওয়ানোর ওষুধ, ভিটামিন বি ও ফলিক অ্যাসিড দেয়া যায়। অ্যাকিউট লিভার ফেইলিউর চিকিৎসায় লিভার ট্রান্সপ্লান্ট (প্রতিস্থাপন) করা হয়। ক্রনিক হেপাটাইটিসে নতুন কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে।

এ সময় শিশুর বিশেষ যত্নের দরকার হয়। খাবার ও ওষুধের ক্ষেত্রে অবলম্বন করতে হবে বিশেষ সতর্কতা । অ্যাসপিরিন–জাতীয় ওষুধ, এ ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার (ডিমের কুসুম, ডেইরি প্রডাক্টস, মাছের তেল) খাওয়াতে হবে, বেশি বেশি তরল খাবার ও পানি খাওয়াতে হবে, শিশুকে ধূমপানমুক্ত পরিবেশে রাখতে হবে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া। বমি হতে থাকলে ৫ মিনিট পরপর বয়সভেদে এক-দুই চামচ করে খাওয়ার স্যালাইন (ওআরএস) খাওয়ানো দরকার। ফলের ঘন রস, জাঙ্ক ফুডস, দুগ্ধজাত খাবার, ঝাল ও মসলাদার খাবার না খাওয়ানো ভালো।