মিয়ানমারে শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ১,৬০০ ছাড়িয়েছে। বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং দরিদ্র এই দেশটিতে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। শুক্রবার দেশটিতে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে বিমানবন্দর, সেতু এবং মহাসড়কসহ অসংখ্য স্থাপনা ধ্বংস করেছে। মিয়ানমার জান্তা শনিবার (২৯ মার্চ) দেশটিতে শত শত বিদেশী উদ্ধার কর্মীদের প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে।
বিবিসি বার্মিজ নিউজ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সামরিক সরকার জানিয়েছে, মিয়ানমারে নিহতের সংখ্যা ১,৬৪৪-তে পৌঁছেছে। প্রতিবেশী থাইল্যান্ডেও এই ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে। সেখানে ব্যাংককে একটি নির্মাণাধীন ভবন ধসে পড়ায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছে।
মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকারীরা ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে খালি হাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছেন।
ব্যাংককে শনিবার উদ্ধারকারীরা ধসে পড়া ৩৩-তলা ভবনের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আটকে পড়া ৪৭ জন শ্রমিককে খুঁজতে অভিযান চালিয়েছে, যাদের মধ্যে মিয়ানমারের শ্রমিকরাও ছিলেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থা ইউএসজিএসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মিয়ানমারের ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পারে ১০ হাজার এবং ক্ষতির পরিমাণ দেশটির বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের চেয়েও বেশি হতে পারে।
ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়ে এক বিরল আহ্বান জানানোর একদিন পর মিয়ানমারের জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মান্দালয়ে পরিদর্শন করেন। রাষ্ট্র-পরিচালিত মিডিয়ার মাধ্যমে জান্তা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান (মিন অং হ্লাইং) উদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে এবং জরুরি চাহিদাগুলো পূরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
মিয়ানমারের বিরোধী দল ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট এনইউজি জানিয়েছে, ভূমিকম্পে অন্তত ২,৯০০ ভবন, ৩০টি রাস্তা এবং ৭টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাজধানী নেইপিদোর বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার ধসে পড়ায় সেটি অকেজো হয়ে গেছে বলে একজন অভ্যন্তরীণ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ওসিএইচএ জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় এবং উত্তর-পশ্চিম মিয়ানমারের হাসপাতালগুলো আহতদের ঢল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে এবং রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাহায্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। শনিবার জানানো হয়, ১৭টি কার্গো ট্রাকে আশ্রয় ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে পাঠানো হচ্ছে, যাতে রক্তের ব্যাগ ও অ্যানাস্থেটিক ওষুধের অভাব মেটানো যায়।
চীনের একটি উদ্ধারকারী দল ইয়াঙ্গুনের বিমানবন্দরে পৌঁছেছে এবং তারা সড়কপথে মান্দালয় ও নেইপিদোর দিকে যাবে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং-এর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং ১৩ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলারের ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে তাবু, কম্বল এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত।
মিয়ানমারের সামরিক নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যুক্তরাষ্ট্রও কিছু সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ভারতীয় সামরিক বিমানে ত্রাণ সরবরাহ ইয়াঙ্গুনে পৌঁছেছে এবং ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আরো ৪০ টন মানবিক সহায়তা নিয়ে জাহাজ পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকেও ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর বাসিন্দারা সাহায্যের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। শুক্রবার দুপুরে আঘাত হানা এই ভূমিকম্প মান্দালয়ের সমভূমি থেকে পূর্বের শান পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে, যার কিছু অংশ জান্তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, উদ্ধার কার্যক্রম এই বিপর্যয়ের তুলনায় অপ্রতুল।










